প্রাচ্যের লাভ জিহাদ, পাশ্চাত্যের গ্রুমিং –একই মুদ্রার দুটি পিঠ

0

Last Updated on

[অন্তিম পর্ব]
দেবাশিস লাহা

ক্রুসেডই প্রথম ধর্মযুদ্ধ, যা ১০৯৬ খ্রিস্টাব্দে শুরু হয়েছিল। যদিও এর এক বছর আগেই পোপ আরবান দ্বিতীয় এই ধর্মযুদ্ধের ডাক দেন। ক্রুসেডের আগে কি কোনো যুদ্ধ হয়নি ? আলবাত হয়েছে, হাজার লক্ষ বার হয়েছে। আদিম সাম্যবাদী সমাজ থেকেই তো যুদ্ধের সূত্রপাত। বন্য জন্তু জানোয়ারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করলে মানুষের অস্তিত্বই বিপন্ন হত। মানুষে মানুষেও যুদ্ধ হয়েছে। মায়া, ইনকা, আজটেক, আর্য –সভ্যতার আদিলগ্ন থেকেই সবাই কম বেশি যুদ্ধ করেছে। কখনও আত্মরক্ষা, কখনও আগ্রাসন, কখনও জমি দখল, কখনও নারী। কিন্তু ধর্ম প্রতিষ্ঠার নামে নিজের আইডেন্টিটি অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার কোনো প্রয়াস ছিলনা। কারণ সভ্যতার আদি লগ্নে সব দেশ, সমাজ, মানুষ পলিথিস্ট অর্থাৎ বহু ঈশ্বরবাদী ছিল। তাই ধর্মের নামে বিশেষ কোনো ঈশ্বর, আল্লা, গড বা সৃষ্টিকর্তাকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রশ্নই ছিলনা। সে মেসোপোটোমিয়াই হোক আর মিশরীয়ই হোক, সিন্ধু সভ্যতাই হোক ঈশ্বর কখনও একমাত্রিক ছিলনা। আর আর্যরা ? জাতিগোষ্ঠীর তকমা লাগিয়ে গৌরবর্ণ, দীর্ঘকায়, টিকালো নাক ইত্যাদি বর্ণনায় ভূষিত আর্যরা আসলে যে একটি ভাষাগোষ্ঠীর বাহক ছিলেন, তা এখন প্রমাণিত। এঁরা সেই অর্থে কোনো ধর্ম চর্চাই করেননি। রিলিজন বলতে আমরা যা বুঝি, আর্য সংস্কৃতিতে তার কোনো স্থানই ছিলনা। আধ্যাত্মিকতা, আত্মানুসন্ধান, জীবন এবং জগতের অপার বিস্ময়ই সেখানে স্থান পেয়েছে। স্থান পেয়েছে জ্ঞান এবং প্রজ্ঞার বিচ্ছুরণ। দশ রাজার যুদ্ধ, মহা জনপদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই, মহা পরাক্রমশালী হিসেবে মগধের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন—এসবই রণভূমির কথা বলে। কিন্তু ধর্ম বা আইডেন্টিটির আগ্রাসন নয়। তবে কখন শুরু হল এই আইডেন্টিটির আগ্রাসন ? উত্তরটি ইতিমধ্যেই জেনে গেছেন। একেশ্বরবাদী [আরও যথাযথভাবে বললে আব্রাহামবাদী] ধর্মের আবির্ভাব হওয়ার পরই শুরু হয়ে গেল এই আইডেন্টিটি চাপিয়ে দেওয়ার লড়াই। আব্রাহামিক ধর্ম বলতে আমরা বুঝি ১] জুদাইজম [অনুসারীরা ইহুদী হিসেবে পরিচিত] ২] খ্রিশ্চিয়ানিটি [অনুসারীরা খ্রিস্টান বলে পরিচিত] ৩] ইসলাম [ অনুসারীরা মুসলমান হিসেবে পরিচিত] তবে ১৮১২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে আবির্ভূত জুদাইজমের সঙ্গে বাকি দুটি আব্রাহামিক ধর্ম অর্থাৎ খ্রিশ্চিয়ানিটি এবং ইসলামের অনেক পার্থক্য ছিল, এখনও আছে। একেশ্বরবাদী হলেও জুদাইজম নিছক রিলিজন নয়, একটি রেইস [race]। অর্থাৎ একটি জাতিগোষ্ঠী। ইংরেজিতে যাকে ethnoreligious বলা হয়। তাই জুদাইজম একই সঙ্গে একটি ধর্ম[ reiigion] এবং জাতি [race]। এই কারণেই যে কেউ চাইলেই ইহুদী হতে পারেনা। অর্থাৎ অন্য দুটি আব্রাহামিক ধর্মে যেমন religious conversion বা ধর্মান্তকরণের পন্থা রয়েছে। একে কাজে লাগিয়েই খ্রিস্টান এবং মুসলমানের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সমগ্র বিশ্বে তাদের আধিপত্য এই জনবলের কারণেই। জনসংখ্যার অপ্রতুলতার জন্যই প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম হয়েও ইহুদীরা আধিপত্য স্থাপনে ব্যর্থ হয়। এমন বললে খুব একটা ভুল বলা হবেনা। বিশ্বের উপর আধিপত্য তো দূরের কথা, নিজের দেশেই তারা অসহায় হয়ে পড়ে। ইহুদীদের মত নিপীড়িত, অত্যাচারিত, উৎপাটিত জনগোষ্ঠী পৃথিবীতে আর নেই। ইসলাম শাসনাধীন ভারতবর্ষে কেবলমাত্র হিন্দুরাই এই জাতীয় অত্যাচারের সম্মুখীন হয়েছিল। পরিতাপের বিষয় এই যে অপর দুটি আব্রাহামিক ধর্মের দ্বারাই ইহুদীরা সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয়েছে। তবে কি ইহুদীরা কখনও অত্যচারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়নি ? নিশ্চয় হয়েছে। তবে সেই ঘটনাগুলিকে ব্যতিক্রম হিসেবেই ধরতে হবে। যেমন যীশু খ্রিস্টকে ক্রুশবিদ্ধ করা। এই ঘটনাটির জন্য সমগ্র ইহুদী সমাজকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়না। যদিও যীশু হত্যাকে collective responsibility আখ্যা দিয়ে ইহুদীদের উপর নিপীড়ন নামিয়ে আনা হয়। সমগ্র ইউরোপ জুড়ে শুরু হওয়া নৃশংস পোগ্রোম [Pogrom] একসময় হিটলারের গ্যাস চেম্বার পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ষাট লক্ষ ইহুদী হত্যার পর [যাকে Holocaust বলে অভিহিত করা হয়] নিপীড়িত জাতিগোষ্ঠীটির পুনর্বাসনের লক্ষ্য নিয়েই ইজরায়েল নামক আধুনিক রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে।বাইশ হাজার বর্গ কিলোমিটারের এই অতি ক্ষুদ্র ইহুদী রাষ্ট্রটিকেও অস্তিত্বরক্ষার জন্য সমগ্র মুসলিম দুনিয়ার বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে।হামাস, হেজবুল্লার মত জিহাদি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন প্রতিনিয়ত তাকে হুমকি দিয়ে চলেছে। আক্রমণও বন্ধ হয়নি। তবে কী দাঁড়াল ! প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম হয়েও ইহুদীরা কোনো আধিপত্যই করতে পারেনি। হ্যাঁ, দেশ তথা ভূখণ্ড দখলের কথাই বলছি। কিন্তু মেধা বা যোগ্যতার তো কোনো অভাব ছিলনা, এখনও নেই।
ইহুদী সম্প্রদায়ের জন্য বিশেষ হোমল্যাণ্ড হিসেবে গড়ে ওঠা (১৯৪৮ সালে) এই দেশটির আকার যতটাই ক্ষুদ্র মেধা ততোটাই তীব্র। জন্ম নেবার মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই দেশটি সম্মিলিত আরব শক্তিকে পরাজিত করে। বিরাশি লক্ষের সামান্য বেশি। (২০১৬ সালের হিসেব ৮২৩৪৪০৮) অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার মাত্র ০.১১%। জনসংখ্যার নিরিখে পৃথিবীতে এই দেশটির স্থান ৯৮। তবু এই দেশটির সামরিক শক্তি আমাদের স্তম্ভিত করে। এমন দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদ খুব দেশেই পাবেন। প্রশ্ন জাগে এত কম সময়ে কী ভাবে এই দেশটি পৃথিবীর অন্যতম সবচেয়ে শক্তিধর ভূখণ্ডে পরিণত হল? সামরিক শক্তিতে প্রথম পনেরোটিদেশের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করল? উত্তর একটাই –মেধা, মেধা এবং মেধা। আর সঙ্গে খানিকটা দেশপ্রেম এবং ডেডিকেশন। পৃথিবীতে যত জিনিয়াস জন্মেছেন তার একটা বড় অংশই ইহুদী। আইনস্টাইন, নীলস বোহর, ম্যাক্স প্লাংক, ফ্রয়েড, ওয়াগনার, বেটোফেন, বাক, কার্ল মাক্স (যদিও তাঁর বাবা হারশেল মার্ক্স ইহুদী বিদ্বেষ থেকে বাঁচার জন্য নিজের ধর্ম লুকিয়ে রাখতেন), এমনকি আপনাদের প্রিয় বব ডিলানও একজন ইহুদী। আমি যাদের নাম বললাম তারা একটি ভগ্নাংশ মাত্র। নোবেল জয়ী ব্যক্তিত্বদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই ইহুদী। অর্থনীতির ৪১%, মেডিসিনের ২৮%, পদার্থবিদ্যার১৬%, রসায়নের ১৩% আর শান্তির ৬% পুরস্কার ওঁরাই পেয়েছেন। আর জেসাস ক্রাইস্ট নিজেও একজন ইহুদি ছিলেন।
তবে ইহুদীরা কেন বিশ্বজয়ে ব্যর্থ হল ? খ্রিশ্চিয়ানিটি এবং ইসলামের বিজয় রথ যেভাবে সমগ্র বিশ্ব তোলপাড় করে ফেলেছে, তরবারির আঘাতে পদানত হয়েছে একটির পর একটি দেশ, জনপদ, যার ফলশ্রুতি হিসেবে পৃথিবীর ৮৭% ভূভাগই এই দুই ধর্মের দখলে। ইসলাম একাই প্রায় ২৫% !প্রায় পঞ্চাশটি দেশে ইসলামের আধিপত্য। জন্ম নেওয়ার মাত্র ১৪০০ বছরের মধ্যে ! উত্তর একটাই। বিশ্ব আধিপত্যের উচ্চাশা নিয়ে জুদাইজমের জন্ম হয়নি। ধর্মান্তকরণের মাধ্যমে সংখ্যা বাড়ানোর কোনো উদ্দেশ্য বা কর্মসূচীও ছিলনা। দার-উল-ইসলাম [ সমগ্র বিশ্বকে ইসলামের শাসনে আনা] এর মত দার উল জুদাইজম বলে কোনো মতবাদও নেই। তাই ইহুদীদের সংখ্যা এক কোটির আশে পাশেই থমকে আছে। ছলে বলে কৌশলে বিশ্ব আধিপত্য স্থাপনের কর্মকাণ্ডটি প্রথমে খ্রিস্টান ধর্মের মধ্যেই দেখা যায়। প্রথম শতাব্দীতে আবির্ভূত হওয়া খ্রিস্ট ধর্মটিকেই পেগান আইডেন্টিটির ভক্ষক হিসেবে চিত্রিত করা যায়। আব্রাহামিক ধর্মগুলোই প্রথম বিধর্মীদের চিহ্নিত করা শুরু করে এবং তাঁদের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত তার নির্দেশিকাও জারি করে। জুদাইজমও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম হিসেবে তাঁরা বিধর্মীদের প্রতি সুতীব্র বিদ্বেষের পাণ্ডুলিপিটি সেভাবে সাজিয়ে উঠতে পারেননি। যা খ্রিস্ট ধর্ম এবং ইসলাম অনেক সুচারুভাবে সম্পন্ন করেছে ।এ কথা অনস্বীকার্য যে খ্রিস্টান ধর্মটিই সর্ব প্রথম ব্যাপক ধর্মান্তরকরণের মাধ্যমে নিজেদের সংখ্যাবৃদ্ধি এবং সুপ্রাচীন পেগান আইডেন্টিটিকে ধ্বংস করার কাজে ব্রতী হয়। যীশুর মৃত্যুর স্বল্প কালের মধ্যেই এটি রাজনৈতিক রূপ [ political christianity] গ্রহণ করে এবং দেশে বিদেশে আধিপত্য বিস্তারে ব্যাপৃত হয়। সুদূর মধ্য প্রাচ্য [আরবের জেরুজালেম] থেকে উদ্ভূত হয়ে মাত্র কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই এটি সমগ্র ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। একথা অনস্বীকার্য যে যীশু প্রবর্তিত এই ধর্মটির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে স্বেচ্ছাতেই অনেকে খ্রিস্টান হয়ে যান। তবে সবাই যে খুব বিগলিত চিত্তে এই ধর্মটি গ্রহণ করেন এময় নয়। প্রলোভন এবং বলপ্রয়োগেরও অজস্র উদাহরণ আছে। এখানে সেই আলোচনার পরিসর নেই। যীশুর মৃত্যুর পরেই তাঁর প্রবর্তিত ধর্মটি বিলুপ্ত হওয়া তো দূরের কথা, বরং আরও বেশি করে ছড়িয়ে পড়েছিল। এর মূলে তাঁর সুযোগ্য শিষ্যদের বিশেষ করে সেইন্ট পলের ভূমিকা অনস্বীকার্য। সেই সঙ্গে রোম্যান সাম্রাজ্যের অপেক্ষাকৃত আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থাটিও নিঃসন্দেহে কাজে এসেছিল। দীর্ঘ তিন দশক ধরে সেইন্ট পল রোম্যান সাম্রাজ্যের প্রায় দশ হাজার মাইল এলাকায় ঘুরে ঘুরে এই ধর্মটি প্রচার করেন। রোম্যান সাম্রাজ্যের বেশ কিছু শহর যেমন করিন্থ, ফিলিপ্পি, এথেন্স ইত্যাদি যথেষ্ঠ জাঁকজমকপূর্ণ এবং সমৃদ্ধিশালী হলেও, আলোর অন্তরালে হাজার হাজার দরিদ্র নাগরিকও ছিলেন। এই সব মানুষের কাছে খ্রিস্ট ধর্ম পৌঁছে দেওয়াটা অনেক সহজ ছিল। মৃত্যুর পরেও অনন্ত জীবনের আবেদন তাঁদের যারপরনাই আকৃষ্ট করেছিল। মজার কথা এই যে সেইন্ট পলের মূল লক্ষ্য ছিলেন ইহুদীরা। সেটিই স্বাভাবিক। [জুদাইজমের সূত্রপাত যেহেতু অনেক আগে হয়েছে] কখনও ইহুদীদের বাড়ি, কখনও সিনাগগে [ইহুদীদের প্রার্থনা গৃহ, হিন্দুদের যেমন মন্দির] প্রবেশ করেও তিনি ধর্ম প্রচারের লিপ্ত হন। কেবল ইহুদী নয়, সব ধর্মের মানুষই তাঁর লক্ষ্য ছিল। খ্রিস্টান ধর্মের অপেক্ষাকৃত উদার নিয়ম কানুন যেমন খাদ্যাখাদ্যের বিধি নিষেধ না থাকা, সারকামসিসন [circumcision] লিঙ্গের অগ্রভাগ ছেদনের নির্দেশিকার অনুপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলি ইহুদীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। বস্তুত পক্ষে এই উদার নিয়ম কানুনই ইহুদী ধর্মের জনপ্রিয়তাকে উল্লেখযোগ্যভাবে আঘাত করেছিল। এভাবেই খ্রিস্ট ধর্ম দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে লাগল।তবে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির পাশাপাশি খিস্টানদের অনেক বিপদের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। ধর্মটি নতুন হওয়াতে বেশ কিছু আচার বিচার অন্যদের চোখে অদ্ভুত মনে হত। সন্দেহ করাও স্বাভাবিক ছিল। ফলে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা দুর্ঘটনার জন্য খ্রিস্টানদের দোষ দেওয়া অত্যন্ত স্বাভাবিক ব্যাপার ছিল। স্থান কাল পাত্র ভেদে ইহুদীদেরও এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয়েছিল। ৬৪ খিস্টাব্দে রোমে যে ভয়াবহ আগুন লাগে তার দায় খ্রিস্টানদের উপরই চাপানো হয়েছিল। সম্রাট নিরো এভাবেই নিজের ব্যর্থতা ঢাকার চেষ্টা করেছিলেন। এই জাতীয় কারণে মাঝে মধ্যেই অনেক খ্রিস্টানকেই হত্যা করা হত। তবে সমস্ত ঝড় ঝাপটা কাটিয়ে এই ধর্মটি একদিন বড় সাফল্য পায়। রোম্যান সাম্রাজ্য জুড়ে খ্রিস্টান ধর্মের সঙ্গে চার্চও যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—৩১৩ খ্রিস্টাব্দ সম্রাট কনস্টানটাইন মিলান এডিক্ট নামক একটি নির্দেশনামা জারি করে এই ধর্মটিকে মান্যতা দিলেন। পরবর্তী দশ বছরের মধ্যেই এটি রোম্যান সাম্রাজ্যের অফিসিয়াল রিলিজন হয়ে উঠল। হ্যাঁ এটাই সবচেয়ে বড় মাইলস্টোন। এর পর এই ধর্মটিকে আর পেছন দিকে তাকাতে হয়নি। তারপর শুধুই এগিয়ে যাওয়া।

সর্বশেষ আব্রাহামিক ধর্ম ইসলাম কিন্তু এভাবে রোম সাম্রাজ্য দখল করেনি। রোম কেন বিশ্বের কোনো দেশই এই পদ্ধতিতে ইসলাম শাসনের অধীন হয়নি। সেইন্ট পলের মত অক্লান্ত ধর্ম প্রচারকের দরকারও পড়েনি। আগেই যেহেতু অন্যান্য দুটি আব্রাহামিক ধর্ম [জুদাইজম এবং খ্রিশ্চিয়ানিটি] আবির্ভূত হয়েছিল, তাদের পর্যবেক্ষণ এবং এবং অধ্যয়ন ইসলামকে শক্তিশালী বুনিয়াদের উপর দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। প্রতিকূল মরুভুমির জলবায়ুতে survival of the fittest এর প্রতীতি অনুসরণ করে, ইহুদীদের টোরাহ এবং ওল্ড টেস্টামেন্ট [এমনকি নিউ টেস্টামেন্ট থেকেও] থেকে মূল্যবান নির্দেশিকা গ্রহণ করে [ইহুদীদের মত খাদ্যাভ্যাস এবং লিঙ্গ ছেদন ইসলামে গৃহীত হয়েছে। ইহুদীদের পবিত্র খাদ্য কোশার, মুসলমানদের হালাল] তবে কিভাবে রোম্যান সাম্রাজ্য ইসলামের দখলে এল ? না, সমগ্র রোম্যান সাম্রাজ্যটি ইসলামের করায়ত্ত হয়নি। ইতিমধ্যেই সেটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। –পূর্ব রোম্যান সাম্রাজ্য এবং পশ্চিম রোম্যান সাম্রাজ্য।
পশ্চিমপ্রান্ত থেকে আঘাত হানে বর্বর জার্মানিক নেতা ওডোসার। ১৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে Western Roman empire এর পতন হয়। সম্রাট রোমুলাসকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে সিংহাসনে বসেন ওডোসার৷ পূর্ব দিকে [Eastern Roman Empire] আঘাত হানে ইসলামী অটোম্যান শক্তি। ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে নির্মম আক্রমণ শানান সুলতান দ্বিতীয় মেহমুদ। কনস্টানটিনোপলের পতন হয়। দোর্দণ্ডপ্রতাপ ইসলামী সেনার আঘাতে বাইজেন্টিয়াম সাম্রাজ্য ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। হাজার বছরের পুরনো খ্রিস্টান গীর্জা হাগিয়া সোফিয়াকে মসজিদে পরিণত করে ইসলাম আর একটি নতুন মাইলস্টোন নির্মাণ করে। কনস্টানটিনোপলের নতুন নামকরণ হয় — ইস্তাম্বুল।

তরবারির মাধ্যমে নিছক দেশ দখল নয়, আইডেনটিটির উপর কব্জা করার ক্ষেত্রেও ইসলাম অনেকটা এগিয়ে ছিল। অন্য দুটি আব্রাহামিক ধর্মের দুর্বলতাগুলি থেকে সে মূল্যবান শিক্ষা গ্রহণ করেছিল। সভ্যতার ইতিহাসে যুদ্ধ একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান। সেই উপলব্ধি থেকেই নবী হজরত মোহম্মদ স্বয়ং তরবারির সাহায্যে ধর্ম প্রচার করার উদাহরণ হয়ে উঠেছিলেন। পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন-ই প্রথম বিধর্মীদের [কাফের] প্রতি একটি সুনির্দিস্ট আচরণ বিধির উল্লেখ করে।বেশ কিছু আয়াতে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশও আছে। ইসলামের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয়েছে এমন অঞ্চলের বিধর্মীদের জিম্মি বলে আখ্যায়িত করা বিধান, জিজিয়া আদায়ের বিধান ইত্যাদির অন্তর্ভূক্তি ইসলামকে ক্রমে একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক শক্তিতেও পরিণত করে। সমসাময়িক যুদ্ধ নির্ভর বিশ্বে যা অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং যুক্তিসঙ্গত ছিল। এই কারণেই খুব কম সময়ের মধ্যেই ইসলাম নামক নতুন আইডেন্টিটিটি সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে আটটি বড় বড় ক্রুসেড লড়েও ইসলাম তার আধিপত্য বজায় রাখতে সক্ষম হয়। তুর্কিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা খিলাফত সাম্রাজ্য বিজয়ের প্রতীক হয়ে ওঠে।যদিও অনেকে বলেন ইসলামের এই দুর্নিবার রূপটি নবী হজরত মহম্মদের একক অবদান নয়। তাঁর মৃত্যুর পর ওমর এবং আবু বকরের নেতৃত্বেই পলিটিকাল ইসলাম অর্থাৎ ইসলামের রাজনৈতিক রূপটি বিপুল শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

ইসলামের এই বিপুল সাফল্যের কারণ কি ? একটু গভীরে গেলেই বোঝা যাবে সর্বশেষ এই আব্রাহামিক ধর্মটিই আইডেন্টিটির গুরুত্ব অনুধাবন করেছিল। বলতে দ্বিধা নেই, এই মহাপুরুষটির ভাবনা এবং দূরদৃষ্টি সত্যই বিস্ময়কর। কোনো প্রশংসাই তাঁর জন্য যথেষ্ট নয়। আবহমানকাল ধরে চলে আসা পেগান আইডেন্টিটির [যার নির্দিষ্ট কোনো প্রবক্তা ছিলনা] বিপরীতে তিনিই প্রথম কৃত্রিম অথচ অসীম শক্তিশালী একটি আইডেন্টিটির জন্ম দেন। যা কেবল মনস্তত্ত্ব নয়, সমগ্র আর্থ সামাজিক, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের চাবিকাঠি হয়ে ওঠে। আইডেন্টিটির গুরুত্ব এবং স্বরূপ এমন গভীরে গিয়ে উপলব্ধি করা –না, জুদাইজম অথবা খ্রিশ্চিয়ানিটি কোনোটিই সেভাবে সফল হয়নি। কি এমন বৈশিষ্ট্য আছে এই ধর্মে যা আগের দুটি আব্রাহামিক ধর্মকে ছাপিয়ে গেল ? একটু ভাবলেই এর উত্তর মিলবে। প্রথমত পেগানিজম,[পৌত্তলিকরাও যার অন্তর্গত] একটি তরল আইডেন্টিটির জন্ম দিয়েছিল। বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস একদিকে যেমন মনকে উন্মুক্ত করে, চিন্তাভাবনার আকাশটি উদার করে, সেই জনগোষ্ঠীর আইডেন্টিটিও তেমন মুক্ত হয়ে পড়ে। সুনির্দিষ্ট ধর্মীয় রীতি নীতির অভাব তাঁদের তেমন করে ঐক্যবদ্ধ করতে পারেনা। অর্থাৎ একদিকে যেমন জ্ঞান বিজ্ঞান দর্শন চিন্তার অবকাশ থাকে[যা সমস্ত পেগান সভ্যতার অঙ্গ] বিপরীতে সাম্প্রদায়িক একতা সেভাবে গড়ে ওঠেনা। ভিন্ন ভিন্ন চিন্তা, মতবাদে বিশ্বাসী ব্যক্তি মানুষ এক একটি দ্বীপ হয়ে ওঠেন। তরল আইডেন্টিটির জনগোষ্ঠীগুলি এই কারণেই শক্তিশালী এবং সুকঠিন আইডেন্টিটি সম্পন্ন জনগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে যুদ্ধে পরাজিত হয়েছিল। আব্রাহামিক ধর্মগুলিই প্রথম একটি সুনির্দিষ্ট এবং সুকঠিন আইডেন্টিটির জন্ম দেয়। যেখানে প্রতিটি ব্যক্তি পরস্পরের কার্বন কপি হয়ে ওঠে। তাঁদের ধর্মীয় বোধ এবং চিন্তাভাবনা একই সূত্রে বাঁধা থাকে। তরলের মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে যায়না। ইস্পাতের মত অবিচল, দৃঢ় থাকে। আর এই আইডেন্টিটিকে যদি রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর ঘটানো যায়, তবে অসীম শক্তিশালী একটি জনগোষ্ঠীর জন্ম হয়। যেখানে প্রতিটি ব্যক্তিমানুষ যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। অর্থাৎ সেনাবাহিনী এবং সাধারণ জনতার মধ্যে মনোবল তথা মানসিক প্রস্তুতির কোনো পার্থক্য থাকেনা। একেশ্বরবাদী ধর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও জুদাইজম কখনই রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তাই আত্মপ্রকাশের পর পরই জুদাইজম কোনো রাজনৈতিক আধিপত্য যেমন দেশ দখল, সাম্রাজ্য গঠন ইত্যাদি করে উঠতে পারেনি। ইহুদীদের এই ধর্মটি রাজনৈতিক আকার লাভ করেছে অনেক পরে।১৮৯৭ সালে যা জায়োনিজম নামে পরিচিত হয়। অত্যাচারিত ইহুদীদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই এটির জন্ম, আধিপত্যের জন্য নয়। অপর দুটি আব্রাহামিক ধর্ম ক্রমশ রাজনৈতিক হয়ে ওঠে। খ্রিশ্চিয়ানিটি এবং ইসলাম এই আধিপত্যের লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতি হিসেবে আটটি বড় সড় ধর্মযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। ১০৯৬ থেকে ১২৯১ পর্যন্ত চলতে থাকা এই “ধর্মযুদ্ধগুলি” নিছক ধর্মের জন্য লড়া হয়নি। ভূখণ্ড তথা জনপদের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করাই প্রধান লক্ষ্য ছিল। খিস্টান ধর্মে বর্ণিত পূণ্যভূমি দখল করার উদ্দেশ্যই পোপ আরবান দ্বিতীয় ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম ক্রুসেডের ডাক দেন। ধর্মের নামে আধিপত্য প্রতিষ্ঠার এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে প্রায় সতের লক্ষ মানুষের প্রাণ যায়। লক্ষণীয় এই যে প্রথম আব্রাহামিক ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও ইহুদীরা ক্রুসেডের যুযুধান পক্ষ হয়ে ওঠেনি।সমসাময়িক জুদাইজম যে রাজনৈতিক আকার গ্রহণ করেনি, এটিই তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ক্রুসেডই প্রমাণ করেছিল জুদাইজম নয়, খ্রিশ্চিয়ানিটি এবং ইসলামই বিশ্বে আধিপত্য বিস্তার করবে। হয়েছেও তাই। তবু আমি ইসলামকেই এগিয়ে রাখছি কেন? কেন বলছি এটিই সবচেয়ে মজবুত এবং দুর্ভেদ্য এন্টি পেগান আব্রাহামিক আইডেন্টিটি ? এটি কেবল খিস্টান ধর্মকে নয়, মনুষ্য সমাজের যাবতীয় আইডেন্টিটির উপর আধিপত্য করতে পারে। কেন বলছি একথা ? কারণ ইসলামই সর্বশেষ আব্রাহামিক ধর্ম। শুধু তাই নয়, এর পর যাতে আর কোনো আব্রাহামিক নতুন ধর্মের জন্ম হতে না পারে, সেব্যাপারেও ইসলাম একটি অভূতপূর্ব পদক্ষেপ নিয়েছে । আর এই পদক্ষেপটিই একে সবচেয়ে শক্তিশালী আইডেন্টিটি প্রদান করেছে। কি সেই পদক্ষেপ ? পূর্ববর্তী নবী, মহাপুরুষ [অবশ্যই আব্রাহামিক ধর্মের] যেমন মোজেস, যীশু ইব্রাহিম ইত্যাদি যারা হজরত মোহম্মদের পূর্বে আবির্ভূত হয়েছিলেন ইসলাম তাঁদের যথোচিত সম্মান জানাতে ভোলেনি। পাশাপাশি এটিও জানিয়ে দিয়েছে হজরত মোহম্মদই শেষ নবী। অর্থাৎ এর পর আর কেউ নিজেকে নবী বলে দাবী করতে পারবেননা। সৃষ্টিকর্তাও তেমন কাউকে পাঠাবেননা। এই নিদানটি দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করল। প্রথমত উম্মা [ মুসলমান সম্প্রদায়] নিজের পরিচয় বা আইডেন্টিটি সম্পর্কে নিশ্চিত হল। কেবল বর্তমান নয়, পৃথিবীর শেষদিন পর্যন্ত তাঁর এই পরিচয়টিই বলবত থাকবে। তাঁর মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ, সংশয় থাকলনা। কোনরকম দ্বিধা দ্বন্দ্ব ছাড়াই সে তার ইমানি কর্তব্য পালন করতে পারবে। এভাবেই ইসলাম একটি অদম্য আইডেন্টিটির জন্ম দিল। দ্বিতীয়ত প্রতিযোগী বা প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আর কোনো আব্রাহামিক ধর্মের উৎপত্তি ঘটার পথটি রুদ্ধ করা হল। যে প্রতিযোগিতা জুদাইজম এবং খ্রিশ্চিয়ানিটিকে ফেইস করতে হয়েছিল ইসলামক সেক্ষেত্রে নিষ্কণ্টক থেকে গেল। এ তো গেল একটি দিক। আর একটি উল্লেখযোগ্য দিক হল কোরবানি অর্থাৎ ধর্মীয় কারণে পশুবলির প্রথাটিকে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা। জুদাইজমে কোরবানির [যা শেচিতা নামেও পরিচিত] সূত্রপাত হলেও ৭০ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ [রোম্যানদের দ্বারা উপাসনালয় ধ্বংসের পর] এই প্রথা বন্ধ হয়ে যায়। খ্রিস্টান ধর্মে এটিকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু ইসলাম এটিকে ফিরিয়ে নিয়ে আসে। এর ফলে দুটি কাজ সম্পন্ন হয়। প্রথমত দরিদ্র মুসলমানদের জন্য সু খাদ্যের ব্যবস্থা [কারণ গোস্ত বিলিয়ে দেওয়ার রীতি আছে] দ্বিতীয়ত সমস্ত সক্ষম মুসলমানের কর্তব্য হিসেবে বিবেচিত হওয়াতে প্রাণিহত্যা, রক্ত এবং হিংসার সঙ্গে ধারাবাহিক পরিচিতির মাধ্যমে নিজেদের যুদ্ধ বা অন্য যে কোনো প্রতিকূল অবস্থার জন্য তৈরি রাখার সুযোগ থাকল। দূরদর্শী নবীর এই দিকটিও অপর একটি আলোচনায় [বিজ্ঞান—ল্যাবরেটরি বনাম প্রকৃতি] তুলে ধরেছি। এভাবে প্রতিটি মুসলমানের সম্ভাব্য যোদ্ধা হয়ে ওঠার পথ প্রস্তুত হল। রক্ত দেখে ভয় পাওয়া বা বিচলিত হওয়ার মত কোনো কাপুরুষোচিত পরিস্থিতির সম্ভাবনাও রইলনা। হ্যাঁ এসব কারণেই ইসলাম একটি শক্তিশালী আইডেন্টিটি এবং বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বৃদ্ধির ধর্ম—ইংরেজিতে বলা হচ্ছে—The fastest growing religion ! মুসলিম নারীদের সন্তান জন্ম দেওয়ার হার [fertility rate] অন্যান্য ধর্মের নারীদের তুলনায় অনেকটাই বেশি। এছাড়াও এই ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়েও অনেক মানুষ ধর্মান্তরিত হচ্ছেন। ইসলামের সুনির্দিষ্ট আইডেন্টিটি তাঁদেরকে পথ দেখাচ্ছে। হ্যাঁ অনেকেই এমন মনে করছেন, বলছেন। Pew Research Center এর একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে— ২০১০ সালের হিসেব অনুযায়ী বিশ্বে ১৬০ কোটি মুসলমান আছে। এই সংখ্যা ২০৫০ সালে ২৭৬ কোটিতে পৌঁছবে। অর্থাৎ পৃথিবীর জনসংখ্যার তিন ভাগের একভাগই হবে মুসলমান সম্প্রদায়। খ্রিস্টান ধর্মটিও বাড়বে। তবে অনেক কম গতিতে। ২০৫০ এ তাঁদের সংখ্যা বর্তমান ২১৭ কোটি থেকে মাত্র ২৯২ কোটিতে পৌঁছবে !আপেক্ষিক বৃদ্ধির হারটি ভাবুন ! চমকে যাবেন। আইডেন্টিটির প্রতি এমন নিষ্ঠা আর কোনো ধর্মে পাবেননা। অনেকে বলেন ইসলাম যেহেতু নবীনতম ধর্ম, তাই আধুনিকতার হাওয়া তাকে সেভাবে স্পর্শ করতে পারেনি। গণতান্ত্রিক বিশ্বে যে ক্রমে বদলে যাবে এবং এক সময় উদার, আধুনিক মনষ্ক হয়ে উঠবে। যেমন খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে ঘটেছে। রোম্যান ক্যাথোলিক ধর্মের মত রক্ষণশীল ধর্মটি থেকেই ইউরোপের সিংহ ভাগ নাস্তিক এবং নন –রিলিজিয়াস মানুষের উত্তরণ ঘটেছে।ভ্যাটিকান ইতিমধ্যেই সমকামী ধর্মগুরুর অনুমোদনও দিয়েছে। পর্যবেক্ষণটি আংশিক সত্য। আমার মনে হয়না অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতেও ইসলাম [বিশেষ করে সুন্নি ইসলাম] নামক অত্যন্ত শক্তিশালী আইডেন্টিটিটি নিজে থেকেই তরল অথবা বাষ্পীভূত হবে। কেউ কেউ বলছেন ফসিল ফুয়েলের অর্থাৎ পেট্রো পণ্যের বিকল্পের বহুল ব্যবহার শুরু হলে সুন্নি ইসলামের [বিশেষ করে ওয়াহাবি ইসলাম] পীঠস্থান তথা পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরবের চরম সংকট ঘনিয়ে আসবে। এই ভাবনাটিও অমূলক। কারণ ফসিল ফুয়েল আবিষ্কারের আগেও ইসলাম ছিল, পরে থাকবে। তখন তেল থেকে উপার্জিত অর্থের পরিবর্তে অন্য উপায়ে পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত থাকবে। কারণ সর্বশেষ নবীর নিদানটি গৃহীত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের সংস্কারের পথটি উল্লেখযোগ্যভাবে অবরুদ্ধ হয়েছে। এক্ষেত্রে মহান নবী এবং তাঁর অগ্রণী অনুগামীকুলের দূরদৃষ্টিকে বাহবা দিতেই হবে। অন্যথায় এমন শক্তিশালী একটি আইডেন্টিটি নির্মিত হতনা। এটি কতটা শক্তিশালী বোঝার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট। বিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক তথা রাজনৈতিক বিপ্লবটির নাম নিঃসন্দেহে বলশেভিক রেভোলিউশন। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিনের নেতৃত্বে সংঘটিত ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এই “দুনিয়া কাঁপানো দশদিন” মুসলিম জনমানসে কোনো প্রভাবই ফেলতে পারেনি। অর্থাৎ বস্তুবাদী মার্ক্সীয় দর্শন ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের কাছে প্রথম থেকেই ব্রাত্য। কতিপয় ব্যতিক্রমী ব্যক্তি মানুষের বিচ্ছিন্ন অংশ গ্রহণ অবশ্যই চোখে পড়ে। তবু এই সব “কম্যুনিস্ট” মুসলমান হজ যাত্রা থেকে কোরবানি সমস্ত ইসলামি রীতি নীতিই মেনে চলেন। আর ইসলামি দেশে মার্ক্সবাদী দল ? উন্মাদের কল্পনা। সৌদি আরবের কথা ছেড়েই দিলাম, প্রতিবেশী বাংলাদেশের দিকে তাকালেই ছবিটি পরিষ্কার হয়ে যাবে। কাগজে কলমে ডজন ডজন দল থাকলেও জন সমর্থন নেই বললেই চলে। রাজনৈতিক আধিপত্য তো দূরের কথা। মার্ক্সবাদের যতটুকু গ্রহণযোগ্যতা সেটিও ইসলামিক বিশ্বের বাইরে।

মার্ক্সবাদ পিছু হটেছে। কিন্তু ইসলাম এবং খ্রিশ্চিয়ানিটি ? কালের প্রবাহে দ্বিতীয়টি উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়ে পড়লেও [ মূলত ইউরোপে। কারণ এই ধর্মটিই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নাস্তিকের জন্ম দিয়েছে।] তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে সে আফ্রিকাই হোক আর এশিয়া, ধর্মান্তকরণের কাজটি চালিয়ে যাচ্ছে। এই দুই আব্রাহামিক ধর্মের কবলে পড়ে নাইজেরিয়ার অবস্থা এখন ভয়াবহ। ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলি, দক্ষিণ ভারতের কেরালা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক এমনকি উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গেও খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মান্তরের কর্মকান্ড পুরোদমে চলেছে। প্রকাশ্যে অথবা গোপনে। সবিস্তারে আলোচনার পরিসর এখানে নেই। কিন্তু ইসলামিক জিহাদ ? আধুনিক বিশ্বের পটভূমিতে সে কি তার কর্মকাণ্ড মুলতুবি রেখেছে ? গণতান্ত্রিক বিশ্বে তরবারির মাধ্যমে ধর্মপ্রচারের পরিস্থিতি বা সুযোগ আর নেই। ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে পত্তন হওয়া অটোম্যান সাম্রাজ্য যা কালক্রমে দক্ষিণ পূর্ব ইউরোপ, পশ্চিম এশিয়া, এবং উত্তর আফ্রিকার সুবিস্তৃত অঞ্চলে আধিপত্য করত, যার অমিত শক্তি ১৪৫৩ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকেও পরাজিত করেছিল, বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগেই ভেঙে পড়ে। ১৪৫৩ থেকে ১৯২২– ইসলামি খিলাফতের রসে সিঞ্চিত ইস্তাম্বুলের [বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে যা কনস্টান্টিনোপল নামে পরিচিত ছিল] পতন হয়। কামাল আতাতুর্কের নেতৃত্বে আত্মপ্রকাশ করে আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ টার্কি। [যদিও সোনার খিলাফতকে ফিরিয়ে আনার স্বপ্নটি আজও রয়ে গেছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি এরদোগ্যান এই মর্মে বেশ কিছু বিবৃতিও জারি করেছেন।] একুশ শতকের মাটিতে পদার্পন করেও ১৪০০ বছর আগে জন্মানো জিহাদ তথা দার-উল-ইসলামের স্বপ্ন এখনও মরেনি। কারণ তা ধর্মীয় মতবাদের অন্তর্গত। বিধর্মীদের [যারা ইসলামি পরিভাষায় কাফের বলে অভিহিত] দ্বারা পরিচালিত দার-উল-হরবকে যেন তেন প্রকারেণ দার-উল-ইসলামে পরিণত করতে হবে। যার অন্যতম পন্থা হল ধর্মান্তর। সেটি বুঝিয়ে হতে পারে, প্রলোভনের মাধ্যমে হতে পারে, সুযোগ থাকলে বলপ্রয়োগও চলতে পারে। এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই পরিবর্তিত বিশ্বেও ইসলামিকরণ থেমে যায়নি, রূপ বদল হয়েছে মাত্র। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, মানবাধিকার, সংখ্যালঘুর অধিকার ইত্যাদি উদারনৈতিক প্রতীতিকে কাজে লাগিয়ে সে নিত্য নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। ধর্মের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিভাজন ইসলামিকরণের একটি নতুন পন্থা। জোর যার মুল্লুক তার –এর জমানায় তরবারির মাধ্যমেই ভূখণ্ডের পর ভূখণ্ড জয় করা সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু মনে রাখতে হবে আলেকজান্ডারের দেশ জয়ের সঙ্গে মোহম্মদ ঘোরি, দ্বিতীয় মেহমুদ ইত্যাদির মূলগত পার্থক্য আছে। প্রথম জন নিছক বীরত্ব প্রদর্শন, সাম্রাজ্য বিস্তারের লক্ষ্য নিয়েই বিশ্ব জয়ে বেরিয়েছিলেন। বিজিত অধিবাসীদের আইডেন্টিটি অর্থাৎ ধর্ম পরিবর্তনের প্রশ্নই ছিলনা। ধর্মান্তকরণ বা religious conversion এর কোনো ধারণাই তখন ছিলনা। কিন্তু ইসলামি শাসকদের দেশ জয় মানেই ধরে নিতে হবে সেই ভূখণ্ডটির সামগ্রিক চরিত্রই বদলে যাওয়া। ইরান, ইরাক, আফগানিস্তান, মিশর থেকে শুরু করে সমগ্র মধ্য প্রাচ্যই এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সুবিশাল আয়তন, শিবাজী, রাণা প্রতাপ, প্রতাপশালী শিখ সম্প্রদায়ের নিরলস প্রতিরোধ ইত্যাদির কারণে এদেশটির পরিপূর্ণ ইসলামিকরণ সম্ভব হয়নি। কিন্তু উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অধিবাসীর ধর্মান্তকরণ সম্ভব হয়েছে যার ফলশ্রতিতেই পাকিস্তান নামক ধর্ম রাষ্ট্রটির প্রতিষ্ঠা। অনেকেই মনে করেন ব্রিটিশ শক্তির দখলে না গেলে ভারতও এতদিনে ইসলামি দেশে রূপান্তরিত হত। তাই প্রখ্যাত ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকার প্রমুখ ব্রিটিশ শাসনের পক্ষে ছিলেন। বর্তমান বিশ্বেও এই প্রক্রিয়াটি বহাল তবিয়তে চলছে। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের গণহত্যা এবং উচ্ছেদ একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। অর্থাৎ কোন একটি এলাকায় সন্ত্রাস চালিয়ে বিধর্মীদের স্থান ত্যাগে বাধ্য করা, অথবা ইসলাম ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া। এভাবেই স্থানটির ডেমোগ্রাফি অর্থাৎ জনবন্যাস বদলে ফেলা যাতে সেটি মুসলমান প্রধান হয়ে ওঠে। সেটি সম্ভব হলে খুব সহজেই ভোট সর্বস্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করা সম্ভব তো বটেই ভিন্ন একটি রাষ্ট্রের দাবিতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনও শুরু করা যেতে পারে। সেটিই ঘটছে। কেবল ভারত নয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রক্রিয়াটি অব্যাহত। অপেক্ষাকৃত উদার বলে পরিচিত ইন্দোনেশিয়াতেও ইসলামি মৌলবাদের উত্থান ঘটেছে। এই দ্বীপ রাষ্ট্রের আজটেক রাজ্যটি এখন শরিয়া শাসনের অধীনে। প্রতিবেশী বাংলাদেশের চিত্রটিও আশাব্যঞ্জক নয়।নাস্তিক, ব্লগার হত্যা, হিন্দু সংখ্যালঘু নিপীড়ন সেখানে নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। তবে সবচেয়ে ভয়াবহ নাইজিরিয়ার অবস্থা। ১৯৫৩ সাল থেকে শুরু হওয়া খ্রিস্টান মুসলিম সংঘাত বোকো হারামের হাত ধরে পৈশাচিক মাত্রা ছুঁয়ে ফেলেছে। সেদেশে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষ ৪৯.৩%, মুসলমান ৪৮.২% ! সংঘর্ষের আদর্শ বাতাবরণ ! বোকো হারামের মত নৃশংস সন্ত্রাসবাদী সংগঠন সেদেশে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। ইসলামিকরণের সাম্প্রতিকতম উদাহরণ অবশ্যই বাংসামোরো। ফিলিপাইনসের মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলটি ২০১৯ সালের ২৬ শে ফেব্রুয়ারি স্বশাসনের অধিকার ছিনিয়ে নিয়েছে। রক্তক্ষয়ী হিংসার মাধ্যমে। জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রতি অনীহাই তাদের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে এ নিয়ে সন্দেহ নেই। রোহিঙ্গা নামক ইসলামিক জাতিগোষ্ঠীটির দিকে তাকালেই ছবিটি পরিষ্কার হয়ে যায়। তবে সব মুসলমানই যে একই পথে চলেছেন এমন ভাবা ভুল হবে। অনেকেই ধার্মিক বিধান মানার জন্যই জন্ম নিয়ন্ত্রণ এড়িয়ে চলেন। কিন্তু তাদের এই সিদ্ধান্তটি প্রকারান্তরে ইসলামি মৌলবাদকেই মজবুত করে। কারণ মুসলমান জন সংখ্যা বাড়লেই গণতন্ত্র তথা ভোট পিপাসু রাজনৈতিক দলকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করা যায়। আশঙ্কার কথা এই যে শিক্ষিত, আধুনিক মনস্ক মুসলমান পুরনো রীতি নীতিকে অমান্য করে মূলস্রোতে সামিল হতে চাইলে মৌলবাদীদের বিষ নজরে পড়ছেন। তাদেরকে মুর্তাদ বলে বিচ্ছিন্ন বা একঘরে করে দেওয়া হচ্ছে।

কিন্তু লাভ জিহাদ ? সেটা আবার কি ! জিহাদের সঙ্গে লাভ অর্থাৎ ভালবাসা শব্দটির মেলবন্ধন কবে, কিভাবে, কেনই বা ঘটল ? ঘড়ি ঘন্টা ধরে লাভ জিহাদের ঠিকুজি উদ্ধার করা সম্ভব না হলেও বাস্তব বুদ্ধি প্রয়োগ করলেই সূত্রপাতের পটভূমিটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লাভ জিহাদের অর্থ জিহাদের লক্ষ্যে ভালবাসা। অর্থাৎ ভালবাসা নিছক একটি অভিনয়, নাটক। ছলনার আশ্রয় নিয়ে ভিন্ন ধর্মের নারীকে ইসলামে নিয়ে আসা অথবা নিছক ভোগ করে ছেড়ে দেওয়া। কারণ কাফের নারী মানেই গনিমতের মাল। তাদের নিয়ে যা ইচ্ছে করা যায়। যদিও ইসলাম ধর্মে নারীদের স্থান যে উন্নত এবং সম্মানের এমন নয়। ইসলামিক দেশগুলিতে নারীর সামাজিক অবস্থান দেখলেই সেটি বোঝা যায়। সুতরাং বিধর্মী নারীর প্রতি মৌলবাদী মুসলমানের দৃষ্টিভঙ্গি কেমন হবে সহজেই অনুমেয়। কিন্তু অভিনয়ের দরকার পড়ল কেন ? পড়বেই তো। তরবারির শাসন অর্থাৎ দেশ তথা জনপদের উপর কর্তৃত্ব যখন আর থাকলনা, অথবা এমন কোনো ভূখণ্ড যেখানে ইসলাম এখনও নিয়ন্ত্রকের আসনে নেই, সেখানে তো যখন তখন বলপ্রয়োগ চলেনা। নারীর উপর দখল কায়েম করতে হলে ছলনার আশ্রয় নিতেই হবে। এই যেমন ধর্মীয় পরিচয় গোপন করে ভাব জমানো। বিবাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস। সম্পর্ক ক্রমে গাঢ় করে তোলা। মেয়েটি যখন সত্য জানতে পারে পিছিয়ে আসার উপায় থাকেনা। প্রথমত দৈহিক, আবেগজনিত আকর্ষণ। দ্বিতীয়ত সংস্কার। কারণ যার সঙ্গে দৈহিক সম্পর্ক হয়েছে তাকেই বিয়ে করা উচিত এমন একটি ধারণা অনেক হিন্দু নারীর মধ্যেই বিদ্যমান। বলাই বাহুল্য ইসলামি শাসন চলাকালীন এই জাতীয় অভিনয়ের দরকার পড়তনা। পরাক্রমশালী শাসক হওয়ার সুবাদে বিধর্মী প্রজাদের যখন তখন ভোগ এবং ব্যবহার করা সম্ভব হত। সিরাজদ্দৌলার নারীলোলুপতা তো কিংবদন্তীর আকার নিয়েছিল। ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার করে তিনি যে কত বিধর্মী নারীকে অত্যাচার, ধর্ষণ করেছিলেন হিসেব নেই। পলাশির যুদ্ধে জয়লাভের পর লর্ড ক্লাইভ যখন মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করেন, হিন্দু নারীরা শাঁখ বাজিয়ে, উলুধ্বনি দিয়ে তাঁকে বরণ করেছিল। পুস্পবৃষ্টিও করা হয়।

মুঘল শাসনের পতনের পর থেকে শুরু করে স্বাধীনতার পরও অন্তঃসলিলা ফল্গুর মত এই লাভ জিহাদের স্রোতটি প্রবাহিত হয়েছে। প্রকাশ্যে এলেও কোনো গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী এসব “তুচ্ছ” বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায়নি। “ধর্মনিরপেক্ষতা” প্রতিপালনের গুরু দায়িত্বটি পালন করতে চাইলে এই জাতীয় সংবেদনশীল বিষয় এড়িয়ে যাওয়াই উচিত। জহরলাল নেহেরুর প্রশ্রয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিকৃত ইতিহাস রচনার পাশাপাশি বাম ইসলামি ভাষ্যটিকেই চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের দ্বারা সংঘটিত ন্যক্কারজনক অপরাধকেও আড়াল করা খুব স্বাভাবিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়ায়।

দক্ষিণ ভারতীয় নারীবাদী কবি কমলা দাসের ঘটনাটিই স্বাধীন ভারতের প্রথম উল্লেখযোগ্য লাভ জিহাদ বলা যায়। ইংরেজি ভাষার উল্লেখযোগ্য ভারতীয় কবি কমলা দাস কেরালার অধিবাসী ছিলেন। উচ্চ বর্ণের গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবারের জন্ম। তিনি মাধবী কুট্টি নামেও পরিচিত। যথাযময়ে বিবাহও হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর ৬৫ বছর বয়সে সাদিক আলি [ যিনি আব্দুল সামাদ সামদানি বলেই বেশি পরিচিত ছিলেন] নামের এক মুসলিম লিগ এম পি-র প্রেমে পড়েন। সাদিক আলির বয়স তখন ৩৮! কমলা দাস তাঁর ডায়েরি, চিঠি ইত্যাদিতে এই কামোদ্দীপক ভালবাসার বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। সব কিছুই গোপনেই চলছিল। সম্ভ্রান্ত বংশীয়া এই নারীটি আচমকাই ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেন। প্রকাশ্য বিবৃতি দেন—””Islam is the religion of love. Hindus have abused and hurt me. They have often tried to scandalize me. I want to love and be loved.”
ভাবুন, হিন্দুরা নাকি তাঁকে অপমান করেছে। এরপর আরও নাটক। তিনি গুরুভায়ুর মন্দির থেকে কৃষ্ণ মূর্তিটি সরিয়ে নিজের কাছে রাখা শুরু করেন। বলেন উনি নাকি মূর্তিটিকে নতুন নাম দিয়েছেন। কী নাম ? হজরত মোহম্মদ ! গুরুভায়ুর মন্দিরটি কৃষ্ণ মন্দির নামেই খ্যাত। কমলা দাসের পূর্ব পুরুষরাই এর প্রতিষ্ঠাতা। কিন্তু তিনি এখন ধর্মান্তরিত কমলা সুরাইয়া। রীতিমত বোরখা পরেন। বিশ্ব হিন্দু পরিষদ তো রেগে আগুন। কবিকে আদালতে টেনে নিয়ে গেলেন। ধর্ম অবমাননার অভিযোগে। বলা হল সুযোগ সুবিধার লোভেই তিনি মুসলমান হয়েছেন। মুসলমান সমাজ তাঁকে দিন রাত আগলে রাখল। এরপর যা হয়। ইসলামি সমাজ তাঁকে মাথায় তুলে নৃত্য করতে লাগল। বড় মাপের এক কবি বুদ্ধিজীবী ইসলাম গ্রহণ করেছেন। চারদিকে সম্মান আর সম্বর্ধনা। ইসলামি দেশগুলি থেকে একের পর এক আমন্ত্রণ। কমলা দাস থেকে কমলা সুরাইয়া হয়ে যাওয়া কবি তখন ইসলামের মহত্ত্ব, উদারতা নিয়ে দিকে দিকে বক্তৃতা করে বেড়াচ্ছেন। কাতার থেকে ফিরে তিনি প্রেমিক সাদিককে টেলিফোন করেন। কিন্তু প্রেমিকটি নিজে কথা না বলে ফোনটি স্ত্রীর হাতে ধরিয়ে দেন। হ্যাঁ তিনি পূর্বেই বিবাহিত । একটি নয়, দু দুটি স্ত্রী। ৬৫ বছরের নারী শরীর তাঁর কতদিন ভাল লাগবে ? অথচ কমলা দাসকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন ইসলাম গ্রহণ করলে অবশ্যই বিয়ে করবেন। সেই আশাতেই কমলা দাস কমলা সুরাইয়া হয়েছিলেন। অসহায় কবি ভেঙে পড়লেন। কিন্তু কিছু করার ছিলনা। সাদিক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। কমলা বড্ড একা হয়ে গেলেন। আত্মীয় পরিজন তাঁকে ইতিমধ্যেই পরিত্যাগ করেছে। চরম হতাশা থেকেও তো উপলব্ধি জন্মায়। কবি জানালেন, বলা ভাল অনুতাপ প্রকাশ করলেন–

“I fell in love with a Muslim after my husband’s death. He was kind and generous in the beginning. But I now feel one shouldn’t change one’s religion. It is not worth it.”.
বাংলা তর্জমা—
স্বামীর মৃত্যুর পর আমি একজন মুসলমানের প্রেমে পড়েছিলাম। প্রথমদিকে সে খুব উদার এবং মহানুভব আচরণ করেছিল। কিন্তু এখন আমি উপলব্ধি করেছি আমার ধর্ম বদলানো উচিত হয়নি। আমি ভুল করেছি।
কিন্তু ততদিনে বড় দেরি হয়ে গেছে। [আগ্রহী পাঠক মেরিলি উইসবর্ড রচিত — The Love Queen of Malabar বইটি পড়ে দেখতে পারেন। বিশদ তথ্য পাবেন।]

কমলা দাস ওরফে মাধবী কুট্টি ওরফে কমলা সুরাইয়ার এই হতাশাব্যঞ্জক পরিণতির জন্য নিছক ইসলাম ধর্মকে দোষ দেওয়া যায়না। এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই জন্মলগ্ন থেকেই ইসলাম আধিপত্যে বিশ্বাসী। কিন্তু অন্য ধর্ম বা সংস্কৃতির দুর্বলতা তাকে অভীষ্ট অর্জনে সহায়তা করেছে। বিদ্যাসাগর মহাশয়ের সক্রিয়তায় বিধবা বিবাহের প্রচলন ঘটলেও বিষয়টি যে এখনও খুব স্বাভাবিকভাবে দেখা হয় এমন নয়। কমলা দাসের সমসাময়িক রক্ষণশীল ব্রাহ্মণ সমাজ যে আরও খড়্গহস্ত ছিল বলাই বাহুল্য। ৬৫ বছরের এক হিন্দু বিধবার পক্ষে পুনর্বিবাহ করা তখন কেন এখনও নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা হবে। অথচ এ বয়সেও যদি একজন নারীর পুরুষ সঙ্গের কামনা জাগে? করনীয় কি ? রক্ষণশীল হিন্দু সমাজের এই দুর্বলতার সুযোগটিই কাজে লাগানো হয়েছিল। ইসলামে বিধবা বিবাহ কোন সমস্যাই নয়। শুরু থেকেই । বিধবাদের প্রতি এই উদারতা প্রদর্শন যদিও কোনো মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়নি। নারী নামক কৃষিক্ষেত্রটি পতিত অবস্থায় থাকলে জনসংখ্যায় লাগাম পড়ে। ইসলাম এক্ষেত্রে যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিয়েছে। মনুবাদী হিন্দু সমাজ সতী দাহকে পবিত্র আখ্যা দিয়ে, বিধবা বিবাহকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে নিজেদের কবর খুঁড়েছে। যদিও অনেকেই মনে করেন ইসলামি শাসনের যাঁতাকলে পড়েই হিন্দু সমাজ এভাবে গুটিয়ে গিয়েছিল। ভয় পাওয়া শামুক যা করে থাকে। সতী দাহ এবং জহর ব্রত ইত্যাদি প্রথা বৈদিক যুগে বিদ্যমান ছিলনা। জাতপাত, অস্পৃশ্যতার কড়াকড়ির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। কিন্তু এতে যে ইসলামের সুবিধাই হয়েছে যে ব্যাপারেও কোনো সন্দেহ নেই। মুসলমান ছুঁয়ে দিলেই যখন হিন্দু নারী অপবিত্র হয়ে যায়, নির্যাতিতা নারীটি কি করবে ? স্বধর্মই যদি তাকে বর্জন করে, ফেরার রাস্তা বন্ধ করে দেয় ধর্মান্তরিত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় থাকে কি ? এছাড়াও মুসলমান নারীকে পুত্রবধু হিসেবে মেনে নেওয়ার উদারতা হিন্দু সমাজ কখনও দেখাতে পারেনি। অপরদিকে বিধর্মী নারী বিবাহে ইসলাম রীতিমত উৎসাহ যুগিয়েছে। একটু গভীরে গেলেই বোঝা যায় হিন্দু সমাজের অজস্র দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েই ইসলাম তার শক্তি বৃদ্ধি করেছে। এখনও করে চলেছে।

এ তো হিন্দু প্রধান ভারতের পরিস্থিতি। কিন্তু ইউরোপ ? সেখানে কি এ জাতীয় ক্রিয়া কলাপ পরিলক্ষিত হয়না ? প্রাচ্যে যা লাভ জিহাদ বলে পরিচিত পাশ্চাত্যে সে কোন রূপে বিদ্যমান ? ভারতের ইসলাম ইউরোপের ইসলাম থেকে ভিন্ন হবে এমন ভাবা বাতুলতা। কারণ বিশ্বের যে কোনো প্রান্তেই মুসলমান সমাজ কোরান, হাদিস মেনেই জীবন অতিবাহিত করে। এটি একটি মোনোথিস্ট, মোনোমর্ফিক মতবাদ। তাই বিধর্মী নারী মাত্রেই গনিমতের মাল। সে ভারতই হোক আর সুইডেন। এব্যাপারে মৌলবাদী মুসলমানদের মানসিকতাও অভিন্ন। এর সঙ্গে আর একটি ধারণা যুক্ত হয়েছে। যাকে culture shock বা সাংস্কৃতিক বিভাজন বলা যেতে পারে। পাশ্চাত্যের নারীর খোলামেলা পোশাক ইসলামি পোশাক রীতি তথা পর্দার বিপরীত। বিধর্মী নারীদের এহেন বেশবাসকে মৌলবাদী মুসলমান inviting ভেবে বসেন, অর্থাৎ নারীটি তাকে ধর্ষণ বা দৈহিক মিলনের জন্য আহ্বান জানাচ্ছে। শৈশব থেকেই বদ্ধ চিন্তাভাবনাকে প্রশ্রয় দিলে ভয়াবহ পরিণাম হতে বাধ্য। মূল প্রসঙ্গে ফেরা যাক। লাভ জিহাদ বলতে এদেশে যা বুঝি, ইউরোপে তার অস্তিত্ব নেই এমন নয়। সেখানেও বিবাহের মাধ্যমে খ্রিস্টান নারীদের ধর্মান্তকরণ ঘটে চলেছে। অবশ্যই যেসব নারীরা এখনও বিবাহ নামক প্রথাটিতে আস্থা রাখেন। [ ফ্রান্স, জার্মানি, সুইডেন, নরওয়ে ইত্যাদি অনেক দেশেই বিয়ে প্রায় উঠেই গেছে] কিন্তু যারা বিয়েতে আগ্রহী নন ? তাছাড়া ইউরোপের মুসলমানদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই শরণার্থী। সিরিয়ান সংকটের আবহে সোমালিয়া, লিবিয়া, মিশর ইত্যাদি দেশ থেকে যে লক্ষ লক্ষ মুসলমান জার্মানি, সুইডেন, ব্রিটেইন, ফ্রান্স, ইটালি ইত্যাদি দেশে আশ্রয় নিয়েছেন তাদের সিংহভাগই পুরুষ। বয়স ১৪ থেকে তিরিশের মধ্যে। অনেকেই প্রশ্ন করছেন পরিবারহীন এই সব পুরুষ ঠিক কি উদ্দেশ্য নিয়ে ইউরোপে হাজির হয়েছে ? সংকট ঘটল সিরিয়ায়, অথচ এই শরণার্থীদের মাত্র ২২% সে দেশ থেকে এসেছে। কিন্তু বাকিরা ? বিষয়টি যথেষ্ট আশংকার এবং ভিন্ন আলোচনার দাবি রাখে।

আসুন, লাভ জিহাদের আর এক রূপ grooming এর সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। যারা সংঘবদ্ধভাবে এই গ্রুমিংএর কাজটি করে তাদের grooming gang বলা হয়। গ্রুমিং গ্যাং পরিভাষাটিকে ইউফিমিজম বলাই ভাল, অর্থাৎ চরম অপ্রিয় কোনো বিষয় বা ঘটনাকে শ্রুতিমধুর করে বলা। গ্রুমিং গ্যাং আসলে রেইপ গ্যাং। কম বয়সী মেয়েদের যাদের বয়স মূলত ১৩ থেকে ২৫, ইমোশনাল সাপোর্ট দেওয়ার ভান করে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা এবং পরিশেষে নির্মমভাবে ধর্ষণ করা। অনেক ক্ষেত্রেই যা রীতিমত গণধর্ষণ।রথারদাম, রকডেল, পিটারবরো, নিউ ক্যাসল, অক্সফোর্ড, ব্রিস্টল ইত্যাদি শহরে শয়ে শয়ে মেয়েকে এই গ্যাং গুলি ধর্ষণ করেছে। বেশ কয়েকজনকে হত্যাও করা হয়েছে। তবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে টেলফোর্ড। ১৯৮০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত এখানে প্রায় এক হাজার কিশোরী, যুবতীকে মাদক খাইয়ে ধর্ষণই কেবল করা হয়নি, নির্মমভাবে মারধোরও করা হয়েছে। অবিশ্বাস্য হলেও ব্রিটিশ পুলিশ এসব নিয়ে কোনো তদন্তই করেনি। অভিযোগ পেলেও চেপে দিয়েছে অথবা ধর্ষিতাকেই অপরাধীর মত ট্রিট করেছে। এই গ্রুমিং গ্যাং তথা ধর্ষক বাহিনীর প্রায় সবাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী, পাকিস্তানী অথবা বাংলাদেশী। ধর্মের ব্যাপারটি যাতে প্রকাশ্যে না আসে তাই এদের এশিয়ান গ্রুমিং গ্যাং তকমা দেওয়া হচ্ছে। অথচ এদের মধ্যে চীনা, কোরিয়ান, জাপানি কেউ নেই । ইংলিশ ডিফেন্স লিগ নামক একটি দক্ষিণপন্থী দলের নেতা টমি রবিনসন প্রথম এই গ্রুমিং গ্যাং-এর ভয়াবহ কর্মকান্ড প্রকাশ্যে আনেন। বিশ্বাস করা তো দূরের কথা মিডিয়া এবং প্রশাসন তাঁকে রেসিস্ট নাজি বলে অভিহিত করে। পরবর্তীতে তিনি সিটিজেনস রিপোর্টার হিসেবে পথে নামেন এবং একটির পর একটি ঘটনা লাইভ ভিডিও, ভিক্টিম ইন্টার্ভিউ ইত্যাদির মাধ্যমে জনগণের সামনে আনেন। প্রশাসনের উপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। অবশেষে টাইম পত্রিকার মত গুরুত্বপূর্ণ প্রিন্ট মিডিয়াটিও গ্রুমিং গ্যাং-এর বাস্তব অস্তিত্ব এবং ভয়াবহতা নিয়ে খবর করতে বাধ্য হয়। বিস্ময়ের কথা এই যে এই সব অপরাধীর বিচার চলাকালীন আদালত চত্ত্বরের আশে পাশে লাইভ ভিডিও রিপোর্টিং করার অপরাধে তাঁকে তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। লেফট, লিবারালদের চাপ, রেসইজ-এর বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ তথা প্রশাসনের অবস্থান ইত্যাদি কারণেই টমি রবিনসনকে কারাগারে যেতে হয়। অথচ হাস্যকর ব্যাপার এই যে ইসলাম কোনো রেইস [race] নয়, ধর্মীয় মতবাদ মাত্র। শাদা চামড়ার ইউরোপিয়ানও ধর্মান্তরের মাধ্যমে মুসলমান হতে পারেন। তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের নিন্দা বা সমালোচনা করা কখনই racism হতে পারেনা।

কত নারী ধর্ষিতা হয়েছেন ? লরা, ক্লারা, ক্যারোলিনা, এলিজাবেথ কত শত নাম ! কেবল ব্রিটেন নয়, সুইডেন, জার্মানি, বেলজিয়াম ইত্যাদি অনেক দেশে এমন কত মেয়ে যে গ্রুমিং গ্যাং-এর শিকার হয়েছে ! ডিপ্রেসন, একাকীত্বের সুযোগ নিয়ে কম বয়সী কিশোরীদের সঙ্গে আলাপ জমানো, তারপর সুযোগ বুঝে ড্রাগ রেপ, গণধর্ষণ। সেদেশেও পুলিশ বেশ নির্বিকার ছিল। মেইন স্ট্রিম মিডিয়াও তথৈবচ।ব্রিটেনের নিউক্যাসল, অক্সফোর্ড, রথারহ্যাম ইত্যাদি এলাকায় প্রায় মহামারীর আকারে ধর্ষণ ছড়িয়ে পড়ে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইট, ইন্ডিপেন্ডেন্ট অনলাইন রিপোর্টিং, দু একজন ডানপন্থী নেতা ছাড়া কেউ উচ্চবাচ্য করেনি। সব ফাঁস হয়ে যাওয়াতে এখন অবশ্য মেইন স্ট্রিম মিডিয়াও নড়ে চড়ে বসেছে। ভারতেও কম বেশি একই চিত্র। সেখানেও লাভ জিহাদের নামে ধর্মান্তকরণ এবং ধর্ষণ দুই চলছে। সেক্ষেত্রেও মেইন স্ট্রিম মিডিয়া এবং প্রশাসন প্রায় নির্বিকার। আবার সেই প্রশ্ন –কেন ? উত্তরটা যে অজানা এমন নয়। বিশ্ব অর্থনীতির চালিকা শক্তি খনিজ তেল। আর সেই সম্পদটি আরব দুনিয়ার দখলে। মূলত সৌদি আরব। উগ্র ইসলামের প্রসারে এই দেশটি যে হারে অর্থ ব্যয় করে, তার প্রভাব রাজনীতি থেকে শুরু করে মিডিয়া সর্বত্রই প্রতিফলিত। কিন্তু প্রগতিশীল, বামপন্থী মানুষ? ইউরোপে যারা লেফট লিবারাল বলে পরিচিত ? তাঁদের ভূমিকাটি বদলাচ্ছে না কেন ? জিহাদের নামে ক্রমবর্ধমান ইসলামিক হিংসার বিরুদ্ধে কেন তাঁরা নীরব থাকছেন ? সবাই কি পেট্রো ডলারের লোভে এই অবস্থান নিচ্ছেন ? না। সেটা ভাবলে অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। সব রাজনৈতিক দলের মধ্যেই ভাল মানুষ থাকেন। বামপন্থীরাও ব্যতিক্রম নন। সমস্যাটা অনেক গভীরে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের প্রতি বামপন্থীদের দুর্বলতার ইতিহাসটি বেশ পুরনো। বলশেভিক দলের কর্মসূচীতে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে সর্বহারা শ্রেনীর অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। কারণটি অনুমেয়। পৃথিবীর দরিদ্রতম মানুষের সবচেয়ে বড় অংশটিই এই ধর্মের। কিন্তু তাঁদের দারিদ্রের মূল কারণ যে ধর্ম, বুর্জোয়া শোষণ নয়, এই সত্যটি এঁরা বুঝতে পারছেন না অথবা চাইছেন না। এমনও হতে পারে সম্ভাব্য কোনো গণহত্যা থেকে ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষকে বাঁচানোর জন্যই তাঁরা রক্ষা কবচের কাজ করছেন। বিশেষ করে ইউরোপের লিবারালরা। নাজিদের দ্বারা সংগঠিত ভয়াবহ ইহুদী গণহত্যার স্মৃতি যে এখনও অমলিন। এবিষয়েও সন্দেহ নেই যে ইহুদী হত্যার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবে ইউরোপের মানুষ বিশেষ করে জার্মানরা এই শরণার্থীদের একটু বেশি উদারতার চোখেই দেখেছেন। এঞ্জেলা মর্কেলের জার্মানিও তো মুসলিম শরণার্থীদের ক্ষেত্রে অত্যন্ত উদার। সিরিয়ান সংকটের সময় প্রথম কিস্তিতেই দশ লক্ষেরও বেশি মুসলমানকে জার্মানিতে আশ্রয় দিয়েছেন। ওদেশের জনতাও খুব সদয়। নিজেদের ঘর বাড়িও ছেড়ে দিয়েছেন। হিটলার প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করেছিলেন। জার্মানরা সেই পাপবোধ এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইহুদীদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় করা হয়েছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যই জার্মানরা ধর্ম, জাত পাত এসবকে ঘৃণার চোখে দেখে। তাঁরা এখন কেবল মনুষ্যত্বের পূজারী। তাই কেবল মর্কেল নন, সাধারণ জার্মান নাগরিকরাও মুসলিম শরণার্থীদের উষ্ণ অভ্যথনা জানিয়েছিল। এটিই মূল কারণ। কেউ কেউ বলেছিলেন সহজলভ্য শ্রম এবং শ্রমিক প্রাপ্তির উদ্দেশ্যেই এই উদারতা। সেটি ভুল ধারণা। কারণ এইসব মুসলিম শরণার্থীদের গড়পড়তা শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা এবং দক্ষতা এতটাই নিম্ন মানের যে জার্মানির মত প্রথম বিশ্বের একটি দেশে কোনো কাজেই আসবেনা। গভীর মানবিকতা থেকেই ওই দেশটি এই বিপুল সংখ্যক মুসলমান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এখন সেটি অতীত। জার্মানির পথে ঘাটে লক্ষ মানুষের মিছিল এখন এই শরণার্থীদেরই বের করে দেওয়ার দাবী জানাচ্ছে। পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। একটি বিশেষ ঘটনার পর।২০১৫-র ৩১ শে ডিসেম্বরের রাত। কোলোন শহরের সেই নারকীয়া ঘটনার পর ছবিটাই যেন বদলে গেছে—
হিটলার প্রায় ষাট লক্ষ ইহুদীকে হত্যা করেছিলেন। জার্মানরা সেই পাপবোধ এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ইহুদীদের বিরুদ্ধে যে অন্যায় করা হয়েছে, তার প্রায়শ্চিত্ত করার জন্যই জার্মানরা ধর্ম, জাত পাত এসবকে ঘৃণার চোখে দেখে। তাঁরা এখন কেবল মনুষ্যত্বের পূজারী। তাই কেবল মর্কেল নন, সাধারণ জার্মান নাগরিকরাও মুসলিম শরণার্থীদের উষ্ণ অভ্যথনা জানিয়েছিল। এটিই মূল কারণ। কেউ কেউ বলেছিলেন সহজলভ্য শ্রম এবং শ্রমিক প্রাপ্তির উদ্দেশ্যেই এই উদারতা। সেটি ভুল ধারণা। কারণ এইসব মুসলিম শরণার্থীদের গড়পড়তা শিক্ষাগত যোগ্যতা, মেধা এবং দক্ষতা এতটাই নিম্ন মানের যে জার্মানির মত প্রথম বিশ্বের একটি দেশে কোনো কাজেই আসবেনা। গভীর মানবিকতা থেকেই ওই দেশটি এই বিপুল সংখ্যক মুসলমান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে। তবে এখন সেটি অতীত। জার্মানির পথে ঘাটে লক্ষ মানুষের মিছিল এখন এই শরণার্থীদেরই বের করে দেওয়ার দাবী জানাচ্ছে। ২০১৫-র ৩১ শে ডিসেম্বরের রাত। কোলোন শহরের সেই নারকীয়া ঘটনার পর ছবিটাই যেন বদলে গেছে—
হ্যনিউ ইয়ার্স ইভের সেলিব্রেশন যা ২০১৬-এর পয়লা জানুয়ারি পর্যন্ত চলেছিল। সেই রাতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা জার্মান জনমানসকে ব্যাপকভাবেই বদলে দিয়েছে। ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন করার উদ্দেশ্যে কোলোনের আপামর জনতা সে রাতেও পথে ঘাটে বেরিয়ে পড়েছিল। প্রতিবার যেমন হয়। মূল জমায়েতটি ছিল সিটি সেন্টার এলাকায়। সেখানেই উন্মাদনায় মেতে থাকা জার্মানদের উপর আচমকাই নরকের অন্ধকার নেমে আসে। গণ ধর্ষণ, শ্লীলতাহানি, ভাঙচুর, চুরি ডাকাতি থেকে শুরু করে সম্ভাব্য অশ্রাব্য গালিগালাজ ভীতি প্রদর্শন –কিছু বাদ যায়নি। ২৪টি ধর্ষণ, ১২০০ কিশোরী, নারীর শ্লীলতাহানি, অসংখ্য চুরি ডাকাতি ! কেবল কোলোন নয়, ডর্টমুণ্ড, ডুসেলডর্ফ, স্টুটগার্ট সর্বত্রই একই ছবি। দুই হাজারের বেশি শরণার্থী এই শহরগুলিতে দাপিয়ে বেড়ায়। অথচ মিডিয়া সংবাদপত্রে কোনো খবরই হয়নি। ধর্মীয় কারণেই এই নারকীয় ঘটনা চেপে যাওয়া হয়। তবে বেশিদিন নয়। সোশ্যাল মিডিয়া সরব হয়ে ওঠে। ফেসবুক, টুইটার সর্বত্র এই সব অপরাধের তথ্য এবং ভিডিও ভাইরাল হতে শুরু করে। একরকম বাধ্য হয়েই মেইন স্ট্রিম মিডিয়া নড়ে চড়ে বসে। সরকারও তদন্ত শুরু করে। অপরাধের ভয়াবহতা সামনে আসতে শুরু করে। বিষয়টি এমন আকার ধারণ করে যে জার্মানির রাজনীতিতেও অভূতপূর্ব প্রভাব পড়ে। এমন প্রভাব যা দু বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল। শক্তিশালী দক্ষিণপন্থী দলের উত্থান। যে দলটিকে কেউ কেউ নব্য নাজিদের সংগঠন বলে চিহ্নিত করেছেন। দলটির নাম –এ এফ ডি –অলটারনেটিভ ফর ডয়েশল্যাণ্ড অর্থাৎ জার্মানি। ২০১৩ সালে বিকল্প রাজনৈতিক দল হিসেবেই এটির জন্ম। দলটির কোনো প্রভাবই ছিলনা। ২০১৭-র ফেডেরাল নির্বাচনে ৯৪টি আসন জয় করে এটিই প্রধান বিরোধী দল হয়ে উঠেছে। দক্ষিণপন্থী জাতীয়াবাদী এই দলটির জনপ্রিয়তা হু হু করে বেড়ে চলেছে। বলাই বাহুল্য দলটিকে রেসিস্ট, ইসলাম বিদ্বেষী এমন কি নব্য নাজিদের সংগঠন বলেও চিহ্নিত করা হচ্ছে। এঁরা জার্মানি তো বটেই সমগ্র ইউরোপ থেকেই শরণার্থীদের তাড়াতে চান।
দেরিতে হলেও ব্রিটেনে গ্রুমিং গ্যাং-এর বিচার শুরু হয়েছে। কিন্তু প্রমাণাভাবে বেশিরভাগ ধর্ষকই ছাড়া পেয়ে গেছে। মাত্র কুড়ি জনকে দোষী সাব্যস্ত করা গেছে। এদের অনেকেই ১১ বছরের কিশোরীকেও ধর্ষণ করেছে। এই বিশেষ গ্যাংটি ২০০৪ থেকে ২০১১ পর্যন্ত এই ধর্ষণ লীলা চালায়। মৃত্যুদণ্ড উঠে যাওয়ায় শাস্তি বলতে এখন কারাদণ্ড। প্রায় প্রত্যেকেরই ১৮ বছর মেয়াদের কারাবাস। আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যাওয়া হাজার হাজার অপরাধী বেশ বহাল তবিয়তেই আছে। শরণার্থী হিসেবে সমস্ত সামাজিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করে চলেছে। গ্রুমিং গ্যাঙ-এর সদস্যরা পরস্পরের জন্য কোড নেইম ব্যবহার করে। যেমন এই গ্যাংটিতে নাহমান মোহম্মদের কোড নেইম ছিল ড্রাকুলা, মোহম্মদ ইমরানের বুলি, আব্দুল রহমানের বিস্টি, নসরাত হুসেনের নাম ছিল নার্স !

লাভ জিহাদই হোক অথবা গ্রুমিং গ্যাং দুটির শিকারই অমুসলিম নারী। তবে এমন ভাবা ভুল যে সমস্ত ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষই এই জাতীয় অপরাধে অংশগ্রহন করে থাকেন। তবে ধর্মীয় অন্ধতার কারণেই যে এই অপরাধগুলির বাড় বাড়ন্ত সে বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই। সব ধর্মেই নারীকে ভোগ্যপণ্য অথবা শস্যক্ষেত্রের মত ব্যবহার করা হয়েছে। নারী মাত্রেই পুরুষের তুলনায় নিকৃষ্ট! পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় এই ধারণাটি এখনও বহাল তবিয়তে বিদ্যমান। ১৪০০ বছর পুরনো ধ্যান ধারণাকে আঁকড়ে থাকলে নারীর অবস্থা আরও শোচনীয় হবে বলাই বাহুল্য। উদাহরণ হিসেবে মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে মিশরের ধর্ষণ খেলা বা রেইপ গেইমটি [ তাহাররুশ জামাই নামে কুখ্যাত] কেবল অমুসলিম নয়, মুসলিম নারীদেরও শিকার বানায়। লিঙ্গ সাম্যের যুগে এসব নারকীয় নারী অবমাননা ঘৃণিত এবং নিন্দার্হ। ধর্মকে হাতিয়ার করে সংঘটিত নারী অবমাননা বন্ধ করার জন্য কঠোর আইনই যথেষ্ট নয়। আইনের প্রয়োগের পাশাপাশি মানসিকতার বদলও জরুরি। ধর্ম শিক্ষার পরিবর্তে আধুনিক শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক মানসিকতার বিস্তার না ঘটালে সামাজিক প্রগতি ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাবে। শুধু তাই নয়।এক শ্রেণির মৌলবাদী মুসলমানের অপরাধ প্রবণতা সমগ্র মুসলিম সমাজকেই কাঠগড়ায় তুলে দেবে, যার পরিণাম অত্যন্ত ভয়াবহ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here