প্রাচ্যের লাভ জিহাদ, পাশ্চাত্যের গ্রুমিং –একই মুদ্রার দুটি পিঠ

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

[২য় পর্ব]

আলবাত যেত ! কিঞ্চিৎ বুদ্ধি প্রয়োগ করলেই বুঝে নেওয়া যায় “ধর্মনিরপেক্ষ” শব্দটিকে ঢুকিয়ে দিয়ে আসলে ইসলামী মৌলবাদকে প্রশ্রয় এবং প্রোমোট করার পরিকল্পনাটিকেই আরও এক কদম এগিয়ে দেওয়া হয়। আরও যথাযথভাবে বললে হিন্দু সংস্কৃতির পীঠস্থান বলে পরিচিত পৃথিবীর সর্বশেষ পলিথিস্ট [বহু-ঈশ্বরবাদী] ভূখণ্ডটিকে একদেশদর্শী আব্রাহামিক মতাদর্শের [যা বিশ্বের ৮৭% ভূখণ্ড নিজেদের দখলে এনেছে] হাতে তুলে দেওয়ার এক গভীর ষড়যন্ত্র যা প্রথম প্রধান মন্ত্রী জহরলাল নেহেরু, এবং শিক্ষা মন্ত্রী মৌলানা আবুল কালাম আজাদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানেই শুরু হয়েছিল। এই কারণেই রমেশচন্দ্র মজুমদারের মত প্রথিতযশা ঐতিহাসিককে আমন্ত্রণ জানিয়েও অবশেষে তারাচাঁদ নামের এক অখ্যাত ঐতিহাসিককে ভারতের ইতিহাস রচনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। হিন্দু সম্প্রদায়কে নিকৃষ্ট, আত্মসমর্পণবাদী, ভীরু, কুসংস্কারগ্রস্ত, বিভেদকামী প্রমাণ করতে ইরফান হাবিব, মোহম্মদ হাবিব, রোমিলা থাপার, কে এন পানিক্কর, বিপান চন্দ্র, মুশিরুল হাসান, বাসুদেব চ্যাটার্জি ইত্যাদি মার্ক্সবাদী “বিজ্ঞানসম্মত” ঐতিহাসিকদের বরাত দেওয়া হয়। নিজস্ব এজেন্ডা রূপায়ণের লক্ষ্য এবং উপযুক্ত দানাপানির ব্যবস্থা দুটিই এক সঙ্গে পূর্ণ হওয়াতে এঁরা হাতে চাঁদ পান। বিস্মৃতির অতলে নিক্ষেপ করা হয় যদুনাথ সরকারের মত স্বনামধন্য ঐতিহাসিকদের। [অমৃতস্য পুত্রাঃ শীর্ষক প্রবন্ধ সংকলনটিতে এবিষয়ে বিশদ আলোচনা রেখেছি।] মুসলমান আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে লড়াই করা ললিতাদিত্য মুক্তিপিদার মত মহান বীরকে ব্রাত্য করে রেখে, শান্তি এবং অহিংসার প্রতীক হিসেবে অশোককে প্রোমোট করে, ইসলামকে মহান ধর্মের তকমা দিয়ে যে ইতিহাসটি লেখা হল সেটি কি সত্যিই ধর্মনিরপেক্ষ ? উপাসনার স্বাধীনতা, ধর্ম বিশ্বাস পালনের অধিকার ইত্যাদির নামে যদি ১৪০০ বছরের পুরনো একটি মতাদর্শকে লালন করা হয়, আধুনিক সমাজ জীবনে তার ফল কী বিষময় হতে পারে, চোখ কান খোলা রাখলেই বুঝে নেওয়া যায়। বিক্রিত ঐতিহাসিকদের দিয়ে বিকৃত ইতিহাস রচনার ফলও কখনও ইতিবাচক হতে পারেনা। কারণ ইসলাম ধর্ম শিক্ষার মধ্যেই নারীর প্রতি বর্বর মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছে। পুরুষের সাপেক্ষে নারীর রক্তমূল্য অর্ধেক ! কাফের অর্থাৎ বিধর্মী নারী হলে তো কথাই নেই। একদিকে পলিথিস্ট [পড়ুন হিন্দু] রীতিনীতি, আচার সংস্কারকে প্রতিনিয়ত ব্যঙ্গ করা, অপরদিকে হজ যাত্রা, মাদ্রাসা শিক্ষার মত ইসলামি বিশ্বাসগুলিকে সুপরিকল্পিতভাবে লালন করা, স্কুল কলেজে ধর্মনিরপেক্ষতা, সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের বুলি কপচানো, মাদ্রাসাগুলিতে দার-উল- ইসলাম প্রতিষ্ঠার পাঠ দেওয়ার ঢালাও বন্দোবস্ত !এই লাভ জিহাদ নামক প্রক্রিয়াটি যে দার-উল- ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ , সেটি বোঝার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হওয়ার দরকার পড়েনা। বিধর্মী ভূখণ্ডের ইসলামিকরণ যেমন জরুরি, বিধর্মী নারীর আইডেন্টিটিকেও ইসলামের ছায়ায় নিয়ে আসাও অত্যাবশ্যক। শুধু তাই নয়। ধর্মান্তকরণের পর তাকে বিয়ে করাও জরুরি। কেন ? কারণ নারীটি যে সন্তান প্রসব করবে সেও অনিবার্যভাবেই পিতৃধর্ম পালন করবে। ধর্মের বিস্তার ঘটবে, গোষ্ঠীবল বৃদ্ধি পাবে। দুটি আব্রাহামিক ধর্মই [জুদাইজম ব্যতীত] অর্থাৎ খ্রিষ্টানিটি এবং ইসলাম এভাবেই তাদের আধিপত্য বিস্তার করেছে। উভয় ক্ষেত্রেই ধর্মান্তকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। আব্রাহামিক ধর্মগুলি [বিশেষত ইসলাম] যাতে নিরুদ্রবে নিজেদের কর্মকাণ্ড বিস্তার করে যেতে পারে সেই লক্ষ্যেই স্বাধীন ভারতের ইতিহাস রচিত হয়েছে, লিখিত হয়েছে সংবিধান !
সদ্য প্রকাশিত অমৃতস্য পুত্রাঃ বইটি থেকে নিম্নলিখিত উদ্ধৃতিটি এক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক হবেনা।
“মাননীয় মার্ক্সবাদী ঐতিহাসিককুল [কতিপয়ের নাম আগেই উল্লেখ করেছি] হয়ত বলবেন যারা আগ্রহী তাঁরা খুঁজে পেতে ইতিহাস পড়ুন না, রাজতরঙ্গিনী পড়ুন, আন্দ্রে উইঙ্ক পড়ুন ! কে বারণ করেছে ! এখানেই তো সমস্যা ! কারণ সাবালক হওয়ার পর আপামর জনতা খুঁজে পেতে ইতিহাস পড়েনা। ইতিহাস তো আর জনপ্রিয় বলিউড আইটেম নয় ! কিন্তু শৈশবে যদি একবার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, সেটিই অবশিষ্ট জীবন নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। আর তাই ধর্মগুরু থেকে শাসক সবাই লক্ষ্যই “কচি মাথা”! চিবিয়ে খাওয়ার মজাই আলাদা। স্বাদও দীর্ঘস্থায়ী। বেশ ধরে নিলাম, ললিতাদিত্যে বড় যুদ্ধ যুদ্ধ “দুর্গন্ধ”, তার উপর তিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন। তাই অশোকের মধ্যে খুঁজে পাওয়া শান্তির “সুবাসটিকে” বেশ খানিকটা জুম করে নিয়ে শিশু কিশোর পাঠ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হল ! শাদা চোখে দেখলে বিষয়টি মন্দ নয়। বিতর্কিত একটি চরিত্রকে মহান দেবতা বানিয়ে শিশু কিশোরদের পরিবেশন করা, যাতে তারা শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠে। তাতে যদি ইতিহাস বেশ খানিক বিকৃত হয় হোকনা ! মূল উদ্দেশ্য জাতি গঠন ! সঠিক ইতিহাস যদি জাতিকে যুদ্ধবাজ, হিংস্র করে তোলে, তাকে বাদ দেওয়াই উচিত ! আহা ! কি বললেন মাইরি ! মুখে ফুল চন্দন পড়ুক ! তা মহান নেহেরুজি ! আপনার এই “Tailor made” শান্তিকামী ইতিহাসটি হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের জন্য নাকি শুধু দেশের সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠীটিকেই শান্তিকামী বানানোর “মতলব”? পরিসংখ্যান বলছে ১৯৪৭ সালে এদেশে মাত্র ৮৮ টি মাদ্রাসা ছিল, ২০০৬ সালে তার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে পাঁচ লাখের উপর। Galloping Growth of Madrasas in India –Identity [Distortion and appropriation] by Ram Ohri] অধমের বিনীত প্রশ্ন এই লক্ষ লক্ষ মাদ্রাসার শতকরা কত ভাগ এই শান্তিবাদী মহান সম্রাটটিকে পাঠ্য নির্ঘণ্টে স্থান দিয়েছে ? ধর্মীয় পুস্তক ছাড়া এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে বিশেষ কিছুই পড়ানো হয়না বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত মাদ্রাসা ছাড়াও খারিজি মাদ্রাসার বাড় বাড়ন্ত যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। দেশ গঠন, কর্মসংস্থান এবং মানব সম্পদ নির্মাণে এরা কোনো ভূমিকাই নিতে পারছেনা। ২০১৭ সালের ২১শে নভেম্বর টাইমস অফ ইণ্ডিয়া পত্রিকার একটি সমীক্ষা এই আশঙ্কাকে তীব্রতর করেছে। দিল্লিতে অবস্থিত প্রায় তিন হাজার মাদ্রাসার উপর চালানো এই সার্ভে জানাচ্ছে
“*Activists warn that the madrasas are churning out vast numbers of malvis, only some of whom can be absorbed into the system.
* Although there is no standardised madrasa syllabus, most follow some form of the 17th century Dars-i-Nizami pattern.
অর্থাৎ সমাজকর্মীরা এই মর্মে সাবধান করছেন সিংহভাগ মাদ্রাসাই ব্যাপক সংখ্যায় মৌলবি প্রসব করছে যাদের অতি অল্প অংশ এই রাষ্ট্র ব্যবস্থার অঙ্গীভূত হতে সক্ষম।
যদিও মাদ্রাসাগুলির কোনো নির্দিস্ট পঠন পাঠন নির্ঘন্ট নেই, বেশির ভাগই সপ্তদশ শতাব্দীর দারস-ই-নিজামি প্যাটার্ন অনুসরণ করছে।
এর ফল কি দাঁড়াচ্ছে ? এই সব মাদ্রাসায় পড়াশোনা করা প্রায় তিন লক্ষ ষাট হাজার ছাত্র ছাত্রী এখনও সপ্তদশ অষ্টাদশ শতাব্দীতেই আটকে আছে। কোনো আধুনিক পেশা অথবা জীবিকার সঙ্গে তাল মেলানো তাদের সাধ্যের বাইরে। ২০১৫ সালের ৩০শে অক্টোবর Financial Times এর একটি রিপোর্ট [Victor Mallet এর লেখা] জানাচ্ছে এদেশের মাদ্রাসাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দেওবন্দী ! যা এই প্রতিবেদকের মতে “Deobandi” has become shorthand for a Sunni Muslim extremist, at least among some commentators. অর্থাৎ দেওবন্দী সুন্নি মুসলিম চরম পন্থীদের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবেই পরিগণিত হয়।”

কী, এবার পরিষ্কার হল তো ২০১৯ এর ২রা এপ্রিল তারিখটি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ? এত এত ধর্মান্তর হওয়া সত্ত্বেও জাতীয় মহিলা কমিশন আগে কেন নড়ে নড়ে বসেনি ? উত্তর খুব সোজা। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে দীর্ঘদিন পর একটি জাতীয়তাবাদী দলের উত্থান ঘটেছে। সেই দলটিই এখন কেন্দ্রীয় ক্ষমতায়। নেহেরু গান্ধীর সংখ্যালঘু তোষণ তথা ভোট ব্যাংকের ভাষ্যটি এই প্রথম মুখ থুবরে পড়েছে। তাই এই প্রথম জাতীয় মহিলা কমিশন ন্যায় সঙ্গত পথ এবং পন্থা অনুসারে কাজ করার সুযোগ পেয়েছে। তার ফলশ্রুতি হিসেবেই এই religious conversion এর সুয়ো মোটো !

বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যাচ্ছেনা। সূত্রপাত হচ্ছে মাত্র। জাতীয় মহিলা কমিশনের প্যাডে লাভ জিহাদের অস্তিত্ব মেনে নেওয়ার একটি সুদীর্ঘ পটভূমি এবং সুদূরপ্রসারী ফলাফল আছে। একটু খেয়াল করলেই বুঝবেন এই গণিমতের মাল [ ইসলামি পরিভাষায় বিধর্মী নারীকে এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই দেখা হয়েছে] অপহরণের সংবাদটি তথাকথিত মেইনস্ট্রিম মিডিয়ায় স্থান পায়নি, শিরোনাম হওয়া তো দূরের কথা। WWW. Mynation. Com শীর্ষক ইন্টারনেট নিউজ পোর্টাল থেকেই মহিলা কমিশন এই খবরটি সংগ্রহ করেছে ! যাকে আর যাই হোক মেইনস্ট্রিম বলা যাবে না ! শুধু কি লাভ জিহাদ ? ব্রিটেনের গুমিং গ্যাং ? ২০১৬ সালের ১লা জানুয়ারি জার্মানির কোলোন শহরে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ তাহাররুশ [ মিশর তথা মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় একটি রেইপ গেইম বা ধর্ষণ খেলা, CBS সাংবাদিক লারা লোগান যার পৈশাচিক স্বাদ ২০১১ সালেই পেয়েছিলেন]? এই বর্বর অপরাধগুলিও তো ইউরোপের মেইনস্ট্রিম মিডিয়া প্রকাশ করেনি। ইন্টারনেটের দৌলতে গড়ে ওঠা ইন্ডিপেন্ডেন্ট নিউজ মিডিয়াই “গণিমতের মাল” বলে বিবেচিত বিধর্মী নারীদের হাহাকার জন সমক্ষে এনেছে। কী ভাবছেন ? হ্যাঁ, গরল কেবল গভীরেই নয়, সর্বব্যাপী, সর্বগ্রাসী ! কিন্তু কেন এই নীরবতা ? [বিধর্মীদের উপর] ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের দ্বারা সংঘটিত অপরাধগুলি আলোতে আনার ব্যাপারে মেইনস্ট্রিম মিডিয়ার কেন এই অনীহা ? কলকাতা থেকে মুম্বাই, স্টকহোম থেকে কোলোন, প্যারিস থেকে কোপেনহেগেন, নিস থেকে নিউ ক্যাসল কেন এই উদাসীনতা ? কতটা সুপরিকল্পিত কতটা অজ্ঞানতা ? বুঝতে হলে আমাদের অনেকটা পিছিয়ে যেতে হবে।

কেন পিছতে হবে ? কেন হবেনা বলুন ? বিষয়টাই যখন লাভ জিহাদ, তখন জিহাদ শব্দটির আবির্ভাব কখন কি পরিস্থিতিতে হল সে বিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত তো করতেই হবে। কোষ্ঠকাঠিন্য বর্ধক পাণ্ডিত্য নয়, সাধারণ পাঠকের কথা মাথায় রেখে সহজ ভাষাতেই বিষয়টি বুঝে নেওয়ার প্রয়াস করা যাক। জিহাদ শব্দটির অর্থ ধর্মযুদ্ধ অর্থাৎ বিধর্মীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে স্বধর্মের প্রতিষ্ঠা। [ যদিও কতিপয় “ধর্মনিরপেক্ষ” পণ্ডিত বলে থাকেন মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে অবিরত লড়াইটিই নাকি জিহাদ-এর প্রকৃত অর্থ। তাঁদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বলি এই আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যাটিই যদি সর্বসম্মত হত, তবে মাত্র চোদ্দশ বছরে পঞ্চাশটির বেশি ইসলামিক দেশ গড়ে উঠতনা। বিশ্বের কুড়ি শতাংশের বেশি ভূখণ্ড ইসলামের অধিকারে যেতনা। এত এত জমির উপর দখলদারি যে বিনা যুদ্ধে, বিনা রক্তপাতে সম্ভব হয়নি, ইতিহাসের এক ছটাক জ্ঞানই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। গত শতাব্দীর মধ্যভাগে পাকিস্তানের জন্ম দিয়েই এই প্রক্রিয়াটি শেষ হয়ে যায়নি। জিহাদের মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ সমস্ত দার-উল-হরব [অমুসলিম দেশ] জুড়েই চলছে। বিবিধ পথ এবং পন্থায়। আধুনিক বিশ্বে ঘোরি, মামুদের মত সরাসরি যুদ্ধবিগ্রহ এবং রক্তপাতের মাধ্যমে বিধর্মী ভূখণ্ডের উপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা অসম্ভব। কারণ প্রযুক্তি বিদ্যা তথা সমরাস্ত্র নির্মাণে অবশিষ্ট বিশ্ব অনেক বেশি এগিয়ে গেছে। তাই প্রত্যক্ষ সংঘাতের মাধ্যমে দার-উল-ইসলামের [সমগ্র বিশ্বে ইসলামের আধিপত্য] এখন আর সম্ভব নয়।তাই জনসংখ্যা বৃদ্ধি, ধর্মান্তকরণ [লাভ জিহাদ এরই একটি রূপ] ইত্যাদির মাধ্যমে ধর্মীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার কাজটি পুরোদমেই চলছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বে যেখানে নাগরিক প্রতি একটি করে ভোট, সেখানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটিয়ে সহজেই একটি দেশ অথবা দেশের অংশকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিভাবে ? অন্যান্য ধর্মীয় গোষ্ঠীর জনসংখ্যা কি বাড়ছেনা ? তবে কিভাবে কেবল ইসলামের আধিপত্যই প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে ?না, বাড়ছেনা। বাড়লেও অত্যন্ত কম হারে বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে তো কমছে। মানে নেতিবাচক বৃদ্ধি ! কেন ? জ্ঞান বিজ্ঞানের প্রসারের ফলে আধুনিক শিক্ষা এবং মননের বিস্তার ঘটেছে। নিছক “শস্যক্ষেত্র” অর্থাৎ সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে নারীদের দেখা হচ্ছেনা। নারীরাও সেটি কোনোমতেই মেনে নিতে চাইছেননা। তাঁরাও শিক্ষায় দীক্ষায় পেশাগত যোগ্যতায় নিজেদের আইডেন্টিটি প্রতিষ্ঠা করছেন। তথাকথিত ধর্মীয় বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এসেছেন। এঁদের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। তাই হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, ইহুদি ইত্যাদি ধর্মে বাল্য বিবাহের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। হয়না বললেই চলে। আর চরম আহাম্মকও জানে বাল্য বিবাহের ফলে সন্তান উৎপাদনের হার অনেক বেড়ে যায়। কারণ fertility period অর্থাৎ প্রজননক্ষম বয়সটির প্রথম থেকেই “সদ্ব্যবহার” হতে থাকে। সমীক্ষায় প্রকাশ [সমীক্ষার রিপোর্ট না পড়লেও চলবে। চোখ কান খোলা থাকলেই যথেষ্ট] ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষের মধ্যেই বাল্য বিবাহের হার সবেচেয়ে বেশি। ‘শিক্ষিত” রাজ্য কেরালা থেকে শুরু করে এরাজ্যের মুর্শিদাবাদ সর্বত্রই একই ছবি। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানটিও নিশ্চয় অনেকের চোখে পড়েছে।মুর্শিদাবাদ জেলাটি এই রাজ্যেই। নিজের চোখেই দেখে আসা যায়। অনেকেই দেখেছেন, দেখছেন। পর্যায়ক্রমে ধর্মনিরপেক্ষ বাম এবং কংগ্রেস শাসিত “শিক্ষিত”, “বিজ্ঞানমনস্ক” কেরালা নামক রাজ্যটির ছবিটিই কিঞ্চিৎ দেখে নেওয়া যাক। Sunday Guardian,[ October, 23, 2016 ] একটি সমীক্ষায় জানা যাচ্ছে ২০০১ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত সেখানে ৪৫০০০ এর বেশি child marriage এর ঘটনা ঘটেছে, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলাগুলিতেই বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বলাই বাহুল্য এই সংখ্যাটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। CRY [ Child Rights and You] নামক সুপরিচিত সংস্থাটিও এবিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। এবং যথেষ্ট বিস্ময়ের সঙ্গে ! কারণ তাঁরা বুঝে উঠতে পারছেননা, কেরালার মত “শিক্ষিত” একটি রাজ্যেও মুসলমান সম্প্রদায়ের এই অবস্থা কেন ? [ব্যক্তিগতভাবে মনে করি এই বিস্ময়টি নিতান্তই অজ্ঞতা থেকে। কারণ ব্রিটেন থেকে জার্মানি, ফ্রান্স থেকে পোল্যান্ড, অষ্ট্রিয়া থেকে ডেনমার্ক ইউরোপের তাবড় তাবড় উন্নত শিক্ষিত দেশেও মুসলমান সম্প্রদায়ের উল্লেখযোগ্য অংশ এই প্রথাটিকেই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।] আসুন Financial Express এ প্রকাশিত [ March, 16, 2019] আর একটি রিপোর্ট দেখে নিই। সেখানে কি বলা হচ্ছে ? রাজ্যের অর্থনীতি এবং পরিসংখ্যান দপ্তর[ Economics and statistics department ] জানাচ্ছে সেই রাজ্যে ২২৫৫২ জন নাবালিকা মা আছে, অর্থাৎ যাদের বয়স ১৯ বছরের নিচে। শুধু তাই নয় এদের মধ্যে ১৩৭ জন ইতিমধ্যেই দুটি সন্তানের জন্ম দিয়ে ফেলেছেন, এগারজন মা এখনও পনের বছরের নিচে। ২১ জন মা ১৯ বছরে পা রাখার আগেই তিনটি সন্তানের জন্ম দিয়ে ফেলেছেন। কী ভাবছেন ? এটিই সামগ্রিক চিত্র ? হে সুপ্রিয় পাঠক, আগেই বলেছি এটি হিমশৈলের চূড়া মাত্র। প্রশ্ন জাগছেনা ? এই বেআইনি কাজটি কিভাবে সম্পন্ন হচ্ছে ? বিবাহের বয়স নারী পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট। তবে কেন এই বাল্যবিবাহ বন্ধ করা যাচ্ছেনা ? অমুসলিমদের ক্ষেত্রে যে আইনটি সহজেই প্রয়োগ করা হচ্ছে, মুসলমানের ক্ষেত্রে এত দ্বিধা কেন ? এর উত্তরটিও জানা। কারণ সমস্ত মুসলিম সংগঠনগুলিই এই প্রথাটি বহাল রাখার পক্ষে। নাবালিকা বিবাহে বাধা দেওয়া মানে Muslim Personal Law এর বিরুদ্ধে যাওয়া যা কোনো ধর্মপ্রাণ মুসলমান মেনে নিতে পারেনা। কিন্তু Muslim Personal Law কি বস্তু ? সন্ধানী পাঠক মাত্রেই জানেন ১৯৩৭ সালের ৭ই অক্টোবর অর্থাৎ ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতে এই আইনটি পাস হয়। এই আইনে বলা হয় ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষ তাঁদের সংস্কৃতি, ধর্ম অনুযায়ী জীবন যাপন করতে পারবেন। বেশ ভাল কথা। কিন্তু স্বাধীন ভারতে যখন হিন্দুদের বহু বিবাহ, বাল বিবাহ ইত্যাদি বিলোপ করে নতুন নতুন আধুনিক আইন প্রণয়ন করা হল, মুসলিম পার্সোনাল ল’ কে সযত্নে লালন করা হল কেন ? “ধর্মনিরপেক্ষতার” এই নমুনা এবং ষড়যন্ত্র নিয়ে আগেই আলোকপাত করেছি। ফলে যা হওয়ার তাই ঘটছে। এই আইনটির দোহাই দিয়ে কেরালাতেও নাবালিকা বিবাহের পক্ষে মুসলিম সংগঠনগুলি আওয়াজ তুলেছে। হিন্দু পত্রিকায়[ ২০১৩ সালের ২২শে সেপ্টেম্বর] এই মর্মে একটি রিপোর্টও প্রকাশিত হয়। কিন্তু কেন এই পরিস্থিতি ? একুশ শতকে পা দিয়েও কেন এই পশ্চাদগামী মানসিকতা ? কী বললেন অশিক্ষা ? দারিদ্র ? উঁহু মোটেই নয়।অশিক্ষা এবং দারিদ্রকে যারা জনসংখ্যা বৃদ্ধির মূল কারণ মনে করেন, তাঁরা মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন। গোবলয় থেকে শুরু করে রোহিঙ্গা সব ক্ষেত্রেই বেশি সন্তান গ্রহণের কারণ হিসেবে এই বুলিটিই আওড়ানো হয়। এই পর্যবেক্ষণটি সত্য হলে উপজাতিদের ( কোল, ভিল, সাঁওতাল, মুণ্ডা ইত্যাদি) সামগ্রিক জনসংখ্যা ৮.৬ শতাংশ নয়, পঞ্চাশ শতাংশ ছাপিয়ে যাওয়ার কথা। তাঁরাই এদেশের আদিম অধিবাসী। বেশি সন্তান গ্রহণের মূল কারণ আসলে ধর্ম। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, আরও ভাল করে বললে আব্রাহামিক ধর্ম। গর্ভপাত তো ছেড়েই দিলাম রোম্যান ক্যাথলিক চার্চ প্রথম থেকেই জন্মনিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে। এখনও যে তারা খুব উদার হয়েছেন তা নয়। বিগত দশকেই অভিযোগ উঠেছে আফ্রিকায় কণ্ডোম ব্যবহারে নিরুৎসাহিত করার কারণে সেখানে এইডস মহামারির আকার নিয়েছে। হ্যাঁ মহান চার্চ তার অনুসারীদের এই উপদেশই দিয়ে আসছিল। এক্ষেত্রে ইসলামের ভূমিকা আর নতুন করে নাই বা বললাম। লোকবলের মাধ্যমে যুদ্ধজয় তথা নতুন নতুন ভূখণ্ডের দখল নেওয়া, ক্রুসেড থেকে শুরু করে অন্যান্য অজস্র কার্যক্রম সেই বার্তাটিই বহন করে এসেছে। প্রকৃতির উপাসক, তাদের প্যাগান বা হিদেন [পলিথিস্টকেই পেগান বলা হয়। এটি অসম্মানসূচক প্রকাশ] যে নামেই ডাকুন, সেই তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। কারণ দেশ বা এলাকা দখলের অভিপ্রায় তাদের ছিল না। আর তাই একুশ শতকে পৌঁছেও তাদের অরণ্যের অধিকারের জন্য লড়াই করতে হচ্ছে। এর চেয়ে যন্ত্রণার বিষয় আর কী হতে পারে! দেখুন আবার বলে বসবেন না কোল, ভিল, সাঁওতাল, মুণ্ডারা দারুণ উচ্চশিক্ষিত এবং দুর্দান্ত মালদার!
Pew Research Centre এর সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এই বাস্তব চিত্রটিই প্রকাশিত হয়েছে। ইসলাম ধর্মাবলম্বী জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার এই মুহূর্তে সর্বাধিক এবং এই প্রবণতা আগামীতেও বজায় থাকবে। কারণ মুসলিম নারীদের গড় TFR [Total Fertility rate] অন্য ধর্মের নারীদের তুলনায় অনেক বেশি। বৌদ্ধ নারীদের ক্ষেত্রে যা মাত্র ১.৬, ইহুদীদের ক্ষেত্রে ২.৩, হিন্দুদের ২.৪, খ্রিস্টানদের ২.৭, মুসলমানদের ক্ষেত্রে সেটিই ৩.১ ! এটি বিশ্বের গড়। ভারত, পাকিস্তান, নাইজেরিয়া, বাংলাদেশ ইত্যাদি রাষ্ট্রে এই হার অনেক বেশি। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য হ্রাসমান TFR এর ফলশ্রুতি হিসেবে বৌদ্ধদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ঋণাত্মক অংক ছুঁয়ে ফেলেছে। মাইনাস সেভেন ! আসুন কিঞ্চিৎ বিশদে জেনে নেওয়া যাক। পিউ রিসার্চ সেন্টার এবিষয়ে একটি গ্রাফ বা সূচক প্রকাশ করেছে যেখানে জনসংখ্যার [ধর্মভিত্তিক] আকৃতিগত পরিবর্তনের ছবিটি [ আগামী পঁয়তাল্লিশ বছরে অর্থাৎ ২০১৫—২০৬০ পর্যন্ত] জলের মত পরিষ্কার । কী বলা হচ্ছে সেখানে ? মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ৭০ ভাগ, খ্রিষ্টান ৩৪%, হিন্দু ২৭%, ইহুদি ১৫%, বৌদ্ধ -৭% হারে বৃদ্ধি পাবে ! এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছেন মায়ানমারের নিরীহ বৌদ্ধরা আচমকা এমন “অসহিষ্ণু” হয়ে উঠলেন কেন ? ইসলাম ধর্মাবলম্বী রোহিঙ্গাদের উপর এমন নিপীড়নই বা নেমে এল কেন ? নোবেলজয়ী আং সাং সু কিও রোহিঙ্গা বিতাড়নকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সমর্থন করলেন কেন ? নিজের দেশে পরবাসী হয়ে উঠতে কে চায় বলুন ? কোনো রাষ্ট্রে ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগুরু হয়ে উঠলে অন্যান্য ধর্মের মানুষদের কী শোচনীয় অবস্থা হয় তা ইসলামিক দেশগুলির দিকে তাকালেই বোঝা যায়। চট্টগ্রামে অবস্থিত রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলিতে কণ্ডোম এবং অন্যান্য গর্ভনিরোধক বিতরণ করার চেষ্টা চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সেদেশে আশ্রয় নেবার পর ইতিমধ্যেই প্রায় সত্তর আশি হাজার রোহিঙ্গা শিশুর জন্য হয়েছে। বৃদ্ধির হারটি এতই বেশি যে স্বয়ং বাংলাদেশ সরকার উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আশপাশের মানুষও রীতিমত আতংকিত। কেন এত বৃদ্ধি ? উত্তর আগেই পেয়েছেন। নাবালিকা বিবাহ ! হ্যাঁ চাইল্ড ম্যারেজ ! দশ বারো বছরেই অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশুর বিবাহ হয়ে যায়। আঠেরোতে পা দেওয়ার সময় কেউই অবিবাহিতা থাকেনা। সমাজসেবীদের যৌনশিক্ষা, পরিবার পরিকল্পনার জ্ঞানে ওরা কেন কর্ণপাত করছেনা ? অশিক্ষা ? মোটেই হয়। বলুন ধর্মশিক্ষা ! গর্ভনিরোধকের প্রসঙ্গ উঠলেই তারা এক বাক্যে জানিয়ে দেয়-এসব হারাম কাজ ! অর্থাৎ ইসলাম সম্মত নয় ! অতএব ! ওরা বাড়ছেই ! বাড়বেই ! আর পরিণতি ? ভাবুন ভাবা প্র্যাকটিস করুন !

কিন্তু জিহাদই বলুন বা ধর্মযুদ্ধ, কেবল ইসলামেরই অবদান ? তবে ক্রুসেড [Crusade] শব্দটি কিভাবে জন্মাল ? এটির অর্থও ধর্মযুদ্ধ ! ধর্ম [religion, কেউ কেউ organised religion বলে থাকেন] বলতে আমরা যা বুঝি তার সূত্রপাত ইসলাম আবির্ভাবের অনেক আগে। যথাযথভাবে বললে আব্রাহামিক ধর্মগুলির [জুদাইজম, খ্রিস্টানিটি, ইসলাম] মাধ্যমেই পৃথিবীতে প্রথম organised religion এর সূত্রপাত। এই তিনটি ধর্মই আদিপুরুষ মহাজ্ঞানী আব্রাহামকে শ্রদ্ধার আসন দিয়ে থাকে বলেই এদের সংক্ষেপে আব্রাহামিক ধর্ম বলা হয়। আদ্যন্ত একেশ্বরবাদী এই ধর্মগুলির মধ্যে জুদাইজম [ইহুদিদের অনুসৃত ধর্ম] সবচেয়ে প্রাচীন। এটির জন্ম আনুমানিক ১৮১২ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে, অর্থাৎ প্রায় ৩৮০০ বছর আগে। মধ্য এশিয়াতে তখন ব্রোঞ্জ যুগ চলছে। যদিও মোজেস প্রণীত টোরাহ [ ইহুদিদের মূল ধর্মগ্রন্থ] এর প্রায় পাঁচশ বছর পরে অর্থাৎ ৩৩০০ বছর আগে ইহুদিদের হাতে আসে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে প্রাচীনতম আব্রাহামিক ধর্ম হয়েও বর্তমানে মাত্র এক কোটি কুড়ি লক্ষ মানুষ এই ধর্মটিকে অনুসরণ করে। অর্থাৎ বিশ্ব জন সংখ্যার মাত্র ০.২% !

এর পর আসে খ্রিষ্টান ধর্ম। প্রথম শতাব্দীকেই আবির্ভাব লগ্ন ধরা হয়। অর্থাৎ প্রায় দু হাজার বছর আগে। বলাই বাহুল্য প্রথম খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের সবাই আসলে ইহুদি ছিলেন। অর্থাৎ জুদাইজম থেকে ধর্মান্তরিত হয়েই খ্রিষ্টান হয়েছিলেন। তাতে কি ? প্রথম দিকে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হলেও মহান সেইন্ট পলের অক্লান্ত পরিশ্রমে এই ধর্মটি ব্যাপক বিস্তার লাভ করে। সবচেয়ে বড় সাফল্যটি আসে ৩১৩ খিস্টাব্দে। রোম্যান সম্রাট কনস্টানস্টাইন মিলান এডিক্টের [মিলান ঘোষণাপত্র] মাধ্যমে খ্রিষ্টান ধর্মকে সম্মান এবং স্বীকৃতি দিয়ে বসলেন। এর দশ বছরের মধ্যেই এটি রোম্যান সাম্রাজ্যের অফিশিয়াল ধর্ম হয়ে উঠল। বর্তমানে এই ধর্মটির অনুসারীর সংখ্যাই সর্বাধিক—২.২ বিলিয়ন ! অর্থাৎ প্রায় দুশ কুড়ি কোটি ‍! বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩১% !
ইসলামের আবির্ভাব সপ্তম শতাব্দীতে। হজরত মোহাম্মদের মৃত্যু হয় ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে। এটিই সর্বশেষ আব্রাহামিক ধর্ম। কারণ মোহাম্মদ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন তিনিই হলেন সর্বশেষ নবী অর্থাৎ প্রফেট ! এরপর আর কাউকেই এই মর্যাদা দেওয়া হবেনা। নিজেকে কেউ নবী বলে দাবি করলে কী পরিণতি হতে পারে সে বিষয়েও যথাযোগ্য আলোচনা রেখে গেছেন। বলাই বাহুল্য সর্বশেষ আব্রাহামিক ধর্ম হওয়াতে পূর্ববর্তী ধর্মগুলির [জুদাইজম এবং খ্রিস্টানিটি] “দোষ ত্রুটি, দুর্বলতাকে “ চিহ্নিত করে ইসলামকে অনেক বেশি শক্তিশালী ধর্ম হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয়। এবিষয়ে হজরত মোহাম্মদের মেধা, প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, দূরদর্শীতাকে শ্রদ্ধা না করে পারা যায়না। অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে মাত্র ১৪০০ বছরেই ইসলাম ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা ১.৮ বিলিয়ন অর্থাৎ ১৮০ কোটি। অর্থাৎ বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ২৪.১% ! এই ধর্মটি কী হারে বাড়ছে সে বিষয়ে ইতিমধ্যেই উল্লেখ করেছি।

নিশ্চয় ভাবছেন লাভ জিহাদ নিয়ে সূত্রপাত হওয়া আলোচনাটি এমন বিস্তৃত হয়ে পড়ছে কেন ? ধৈর্য রাখলেই বুঝবেন ছুঁয়ে যাওয়া কোনো বিষয়ই এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়। লাভ জিহাদ বিষয়টি বুঝতে হলে জিহাদ অর্থাৎ ধর্মযুদ্ধ বিষয়টি বুঝতে হবে। এরই অঙ্গ হল লাভ জিহাদ ! এ বিশ্বে প্রথম ধর্মযুদ্ধের সূত্রপাত কিন্তু ইসলামিক জিহাদ দিয়ে নয়, খ্রিস্টান ক্রুসেডের মাধ্যমে ! হ্যাঁ ঠিকই শুনেছেন crusade ! কারা এই ধর্মযুদ্ধের ডাক দেয় ? কেন খ্রিস্টানরা, যথাযথভাবে বললে সম্রাট আলেক্সিয়াসের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করে ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দে পোপ আরবান দ্বিতীয় [Pope Urban II] প্রথম ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের ডাক দেন। কাদের বিরুদ্ধে ? অবশ্যই মুসলমানদের বিরুদ্ধে। 1096 and 1291 স্থায়ী হওয়া এই ধর্মযুদ্ধের উদ্দেশ্য কি ছিল ? ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান মিলিশিয়া অর্থাৎ ধর্মযোদ্ধাদের সাহায্য নিয়ে পবিত্র এলাকা বা তীর্থস্থানগুলির দখল নেওয়া ! প্রশ্ন জাগছে না ? নিজেদের পবিত্র ভূমি নিজেদের দখলে রাখবেন, তার জন্য আবার যুদ্ধ কেন ? এখানেই তো যত গোলমাল ! কারণ খিস্টান, ইহুদি এবং মুসলমানদের কিছু ‘common holy sites’ অর্থাৎ এমন কিছু পবিত্র ভূমি বা তীর্থস্থান যা তিনটি সম্প্রদায়ের কাছেই আকাঙ্ক্ষিত এবং প্রেস্টিজ ইস্যু ! যেমন জেরুজালেম ! কেন এমন হল ? ওই যে বলেছি তিনটি ধর্মের মূল অভিন্ন –সেই মহান পিতা আব্রাহাম। তাই নিছক তীর্থস্থান নয়, অনেক নিয়ম কানুন আচার আচরণ, ধর্মীয় বিধান ইত্যাদিতেও সাদৃশ্য পাওয়া যায়।1096 and 1291 পর্যন্ত আটটি বড় ধর্মযুদ্ধ লড়া হয়। ফল কি হয়েছিল ? এ নিয়ে দ্বিমত আছে। তবে চাক্ষুষ ফলাফল ইসলামের বিজয়কেই প্রতিষ্ঠিত করে। প্রথম দিকে খ্রিস্টানরা জেরুজালেমের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়। কিন্তু পরবর্তীকালে সম্রাট সালাদিন সেটি পুনরুদ্ধার করেন। শুধু তাই নয়, স্পেন দেশটিও ইসলামিস্টদের দখলে থেকে যায়। অনেক পরে [১৪৯২ সালে] দেশটিকে ইসলামমুক্ত করা হয় এবং খ্রিস্টানরা পুনরায় ক্ষমতা দখল করে। ইউরোপিয়ানরা [পড়ুন খ্রিস্টানরা] পরাজিত হলেও ক্রুসেড সমাপ্ত হওয়ার পর পোপের প্রতিপত্তি বেড়ে যায়, রোম্যান ক্যাথলিক চার্চের সম্পদও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
স্বভাবতই প্রশ্ন উঠবে—১] ক্রুসেডই কি প্রথম ধর্মযুদ্ধ ? এর আগে কি কোনও ধর্মযুদ্ধ হয়নি, জিহাদ ঘটেনি ? যদি না হয়ে থাকে, কেন হয়নি ? ২] প্রাচীনতম আব্রাহামিক ধর্ম হয়েও এই জুদাইজম অনুসারীদের সংখ্যা এত কম কেন ? অনেক পরে যাত্রা শুরু করেও খ্রিস্টান ধর্ম দুশ কুড়ি কোটি মানুষ জুটিয়ে ফেলল, ইসলাম [মাত্র ১৪০০ বছরে] ১৮০ কোটি ! আর জুদাইজম মাত্র এক কোটি কুড়ি লক্ষ ! প্রতিটি ইসলাম ধর্মাবলম্বী মানুষই কি লাভ জিহাদি? প্রত্যেকেই কি জিহাদের ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ ? তবে শিয়া সম্প্রদায়ের উপর সুন্নিদের হিংসাত্মক হামলা হয় কেন ? আলোকপ্রাপ্ত, আধুনিকমনস্ক মুসলমানদের নাস্তিক ঘোষণা করে হত্যা করা কেন ? অবাক হচ্ছেন না ? আলবৎ হচ্ছেন ! তবে উত্তর যাদের জানা আছে, তাঁরাই বুঝবেন প্রশ্নগুলি কতটা গুরুত্বপূর্ণ ! বিশ্ব ইতিহাসের গতি এবং মোড় কিভাবে পরিবর্তিত, বিবর্তিত সর্বোপরি বিকৃত হল, জিজ্ঞাসাগুলির উত্তর পেলেই জলের মত পরিষ্কার হয়ে যাবে।

[চলবে]

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here