খাদ্য যখন নৈবেদ্য

0

Last Updated on

দেবাশিস লাহা

বিশ্বকবিই সম্ভবত একমাত্র সাহিত্যিক, যিনি ঠাকুর বেশি, কবি কম । তাঁর উপাসক আছে, পাঠক নেই। কেন এমন ঘটল? কারণ অথবা প্রেক্ষাপট আলোচনার যথোচিত পরিসর এখানে নেই। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হেতুটি হল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে আমরা হৃদয়ে রেখেছি, মগজে ঢোকাইনি। এক শিল্পী তো গেয়েই ফেলেছেন, সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ —-
এর প্রধান কারণ হল রবীন্দ্রনাথ গান লিখেছিলেন, সুর দিয়েছিলেন, নিজেও গেয়েছিলেন। যা বিশ্বসাহিত্যের রথী মহারথীরা কেউই করেননি, অথবা পারেননি, অথবা সেই পথ মাড়ান নি। শেক্সপীয়র, গ্যেটে, দান্তে, ভার্জিল থেকে শুরু করে মায়োকোভোস্কি জীবনানন্দ, না কেউ না! তাই এঁদের উপলব্ধি করতে হলে মগজ দিয়েই করতে হয়। কিন্তু হৃদয় ব্যাপারটি কি? রক্ত পাম্প করার মেসিনটিকে আমরা নিশ্চয় হৃদয় বলিনা। বলি কি? তবে সেটি কি? একটু ভাবলেই বুঝবেন অহরহ যাকে হৃদয় বলে ডাকছি সে আসলে মস্তিষ্কেরই একটি যুক্তিহীন আবেগপ্রবণ সত্ত্বা, যা কেবল অন্ধের মত গ্রহণ করে, বিশ্লেষণ করেনা। এই মহাবিশ্বে যত শিল্প মাধ্যম আছে, গানই তাদের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী। কবিতা, ছবি, ভাস্কর্য, গল্প উপন্যাস, প্রবন্ধ ধারের কাছে আসবে না। তিন চার মিনিটের একটি গান সেই তুলনায় অনেক শক্তিশালী কারণ সে জনপ্রিয় হওয়ার ক্ষমতা রাখে। সে তো ভাল কথা। কিন্তু সেই জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তিটি কি? কথা না সুর? বক্তব্য না মূর্ছনা? অনিবার্যভাবেই সুর। গানে সুরের ভূমিকা এতটা প্রবল যে প্রখ্যাত সঙ্গীতকার ওয়াগনার বলেছিলেন — Give me a laundry list, I’ll set it to music! অর্থাৎ আমাকে একটি লণ্ড্রী তালিকা দিন, আমি সুর দিয়ে গান বানিয়ে ফেলব। এই পর্যবেক্ষণটির মাধ্যমেই সুরের অবিসংবাদিত ভূমিকাটির আন্দাজ পাওয়া যায়। বলাই বাহুল্য সুর মগজে নয়, হৃদয়ে প্রবেশ করে। আর হৃদয় বস্তুটি আসলে কি তা আগেই বলেছি। সুর নামক এই ডায়োনিসিয়ান ( মদের দেবতা ডাওনিসাস থেকে এই শব্দটির জন্ম। বুঝতেই পারছেন ইঙ্গিতটি কি) উদ্দীপকটি আমাদের আবেগকে এতটাই আচ্ছন্ন করে যে গানের কথা বা বক্তব্য গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে। তাই মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা –বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক যাক শুনতে শুনতে / গাইতে গাইতে বোরখাটি আরও একবার ঠিক করে নেওয়া যায়, চুমু খাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে বেধড়ক পেটানো যায়, বাড়ির বউ একটু দেরি করে ফিরলে আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে দু কথা শুনিয়েও দেওয়া যায়। অথচ রবি ঠাকুরের গানে যে সব প্রগতিবাদী বার্তা আছে , তা সে যুগে দাঁড়িয়ে কল্পনা করাও অসম্ভব। কিন্তু ভাষাশৈলীর আবরণ ভেদ করে ভেতরের শাঁসটা বের করে আনার ক্ষমতা খুব কম বাঙালীরই আছে।প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে রবি ঠাকুরের সাহিত্য নিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় কারও নেই বলে প্রায় সবাই চেতন অবচেতনে ধরেই নিলেন রবীন্দ্রনাথ মানেই বুঝি গান। কেউ পড়ল না এমন নয়। কিন্তু যারা বুঝল তারা বোঝানোর সুযোগ পেল না , যারা বুঝল না, তারা বোঝাল। ফলত বাঙালী যা পেল, তা আধ্যাত্মিক রবীন্দ্রনাথ, জাগতিক নয়। রক্তমাংসের একটি মানুষকে যৌনতাবর্জিত, এক মহান সাধুবাবা বানিয়ে ফেলা হল। মগজহীন, লিঙ্গহীন এক পরমাত্মা। রবীন্দ্রসংগীতে ক্রমে ক্রমে শ্যামাসংগীতের স্বাদ প্রকট হয়ে উঠল। যা খাদ্য হওয়ার কথা ছিল, তাকে নৈবেদ্য বানিয়ে ফেলা হল। যা মানুষ বা দেবতা কেউই খায় না। যদিও বা কেউ খেয়ে ফেলে, তাতে এত শ্রদ্ধা আর সমীহ থাকে যে চাল কিম্বা কলার প্রকৃত স্বাদটি তার জানা হয়ে ওঠেনা।শেক্সপীয়র, মিল্টন, বার্নাড শ কে গ্রহণ, অনুশীলন, নির্মাণ, বিনির্মাণ করে ইংরেজি সাহিত্য এগিয়ে চলল, লেখক এবং পাঠকের নব নব যুগলবন্দী হল । শেক্সপীয়রও ব্রাত্য হলেন না, মিল্টনও থেকে গেলেন। কিন্তু বাঙালী মনন তথা বাংলা সাহিত্য যেন এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে রইল। আপন মনের মাধুরি মিশিয়ে বানিয়ে নেওয়া এক কাল্পনিক বৃত্ত থেকে লেখক, পাঠক কেউই বেরোতে পারলেন না।
যদিও বা কেউ কেউ প্রয়াস করেন, পাঠক তাকে গ্রহণ করে না। কারণ একটিই রবি ঠাকুর হৃদয়েই আটকে থাকেন, মগজ অবধি পৌঁছোন না। তাই রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর আট দশক পরেও বাঙালি মানস লিভ ইন, মুক্ত যৌনতা, সমকামিতা ইত্যাদি শব্দগুলিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ তো দূরের কথা, বিজাতীয় ঘৃণার চোখে দেখে।

রবীন্দ্রনাথ নিছক মহাপুরুষ নন, কালপুরুষ। হিটলারও তাই। কিন্তু দুজনের কেউই asset হয়ে উঠতে পারলেন না। একজন অব্যবহৃত, আর একজন ব্যবহারের অযোগ্য!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here