চৈতন্যদেব কি নবাব হুসেন শাহের ভয়ে গৌড় থেকে হিন্দু রাজ্য পুরী পালিয়ে গেলেন?

0
Sri Chaitanya

Last Updated on

রামকৃষ্ণের ফৌজ

চৈতন্য মহাপ্রভু 24 বছর বয়সে চাঁদ কাজীর সঙ্গে এক ঝামেলায় জড়িয়ে পড়েন। চাঁদ কাজী নবদ্বীপে হরিনাম সংকীর্তন করা নিষিদ্ধ করে। নিমাই ক্ষেপে গিয়ে বলেন, “আজ আমি যবন সংহার করবো”। তিনি দলবল জুটিয়ে, ঘরে ঘরে মশাল জ্বালিয়ে, হরিনাম সংকীর্তন করতে করতে চাঁদ কাজীর বাড়িতে গিয়ে হাজির হন। জনগণ ক্ষিপ্ত হয়ে চাঁদ কাজীর বাড়ীর, বাগানের ও গাছপালার ক্ষতি সাধন করে। চাঁদ কাজী সঙ্ঘবদ্ধ হিন্দু শক্তি দেখে সাময়িক পরাভব স্বীকার করে। ঝামেলা এড়াতে মেনে নিলো যে, সে আর নবদ্বীপে খোল কর্তাল বাজিয়ে হরিনাম করতে বাধা দেবেনা। এর কয়েক মাস পরে নদের নিমাই নদীয়া ছেড়ে হিন্দু শাসিত ওড়িশ্যার পুরী নগরীতে চলে যান।সেখানে তিনি 24 বছর ছিলেন। এখান থেকে তিনি দক্ষিণ ভারত ভ্রমণ করে পুরী ফিরে আসেন। এরপর তিনি মনস্থির করেন মথুরা বৃন্দাবন ভ্রমণ করবেন।
. সেযুগে পুরী থেকে হেঁটে কোলাঘাটের কাছে গঙ্গা নদীতে এসে নৌকা করে, কোলকাতা, নবদ্বীপ, বহরমপুর, মালদা হয়ে প্রয়াগ যেতে হতো। তারপর যমুনা নদী ধরে আগ্রা হয়ে মথুরা বৃন্দাবন যেতে হতো। সে যাই হোক মহাপ্রভু এই রুটে এসে নবদ্বীপ এলেন। ভক্তদের সঙ্গে দেখা করলেন। কয়েকজন ভক্ত নিয়ে তিনি মালদা বা গৌড় পৌঁছালেন। এবার তাঁর সামনে বিপদের সূচনা হলো। নবাব হুসেন শাহের এক কর্মচারী ছিলেন, নাম তাঁর কেশব ছত্রী। এবার কি ঘটলো তা আমি কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর শ্লোক থেকে বর্ণনা করছি।
. “মুসলমান নবাব তার অনুচর কেশব ছত্রীকে চৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাবের কথা জিজ্ঞাসা করলেন, কিন্তু কেশব ছত্রি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রভাব সম্বন্ধে অবগত হওয়া সত্ত্বেও তা প্রকাশ না করার চেষ্টা করলেন”। ( শ্লোক – 171)
. “কেশব ছত্রি মুসলমান নবাবকে খবর দিলেন যে, চৈতন্য হচ্ছেন একজন পর্যটনকারী সন্ন্যাসী এবং তাঁকে দেখার জন্য কেবল দুই একজন মানুষ আসছে”। (172)
. ” কেশব ছত্রি আরও বললেন, আপনার যবন অনুচরেরা হিংসা করে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। আমার মনে হয় তার প্রতি হিংসাপরায়ণ হয়ে কোন লাভ নেই, পক্ষান্তরে তার ফলে ক্ষতিই হবে”। (173)
. নবাবকে প্রবোধ দিয়ে কেশব ছত্রি এক ব্রাহ্মণকে মহাপ্রভুর কাছে পাঠিয়ে তিনি অনুরোধ করলেন, তিনি যেন অবিলম্বে গৌড় নগরী ছেড়ে চলে যান। (174)
. ঘটনা পরিষ্কার যে নিমাইএর জীবনহানী বা ঐ ধরণের ক্ষতির আশঙ্কা কেশব ছত্রির মনে উদয় হয়েছিলো। ঘটনা এখানেই শেষ নয়, নবাব হুসেন শাহ এর পর দবির খাস ও সাকর মল্লিক নামে দুই রাজ কর্মচারীকে নিভৃতে ডেকে পাঠান এবং খবর নিলেন চৈতন্য সম্পর্কে। দবির খাস ও সাকর মল্লিকের সঙ্গে গোপন আলোচনা করে নবাব হুসেন শাহ প্রাসাদের ভিতরে চলে গেলেন।(181)॥
. গৃহে ফিরে এসে দবির খাস ও সাকর মল্লিক দুই ভাই পরামর্শ করলেন এবং সিদ্ধান্ত করলেন গভীর রাত্রে দুই ভাই ছদ্মবেশে মহাপ্রভুকে দর্শন করতে যাবেন।(182)॥
. অর্ধরাত্রে দুইভাই, দবির খাস ও সাকর মল্লিক, ছদ্মবেশে চৈতন্য মহাপ্রভুর সঙ্গে সাক্ষাত্ করতে গিয়েছিলেন। প্রথমে তাদের শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু ও এবং হরিদাস ঠাকুরের মিলন হয়েছিলো। (183)॥
. শ্রীনিত্যানন্দ প্রভু এবং হরিদাস ঠাকুর মহাপ্রভুকে জানালেন যে, দবির খাস ও সাকর মল্লিক তাঁকে দর্শন করার জন্য এসেছেন। (184)॥
. প্রথমে দুই ভাই দবির খাস ও সাকর মল্লিক দীক্ষা নেওয়ার জন্য প্রার্থনা করেন এবং মহাপ্রভু উভয়কে দীক্ষা দান করেন। চৈতন্য উভয়ের নতুন নাম করণ করেন — রূপ এবং সনাতন।
. দীক্ষা নেওয়া সমাপন হলে রূপ ও সনাতন বললেন এত লোকজন নিয়ে বৃন্দাবন গেলে মুসলমান নবাবের দিক থেকে ভয়ংকর বিপদ আসতে পারে।
. ” সমস্ত বৈষ্ণবদের আদেশ গ্রহণ করে বিদায় গ্রহণ করার সময় দুই ভাই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর পাদপদ্মে অত্যন্ত বিনীত ভাবে নিবেদন করলেন — প্রভু, যদিও বাঙলার নবাব হুসেন শাহ আপনাকে অত্যন্ত শ্রদ্ধা করেন, তথাপি যেহেতু আপনার এখানে আর কোনও কাজ নেই, তাই আর এখানে থাকবেন না। (221 & 222)॥
. “এই বলে দুই ভাই তাদের গৃহে প্রত্যাবর্তন করলেন। তখন চৈতন্য সেই গ্রাম ছেড়ে যাওয়ার বাসনা করলেন”। (226)॥
. ” মনে মনে ঐভাবে বিবেচনা করে মহাপ্রভু সকালে গঙ্গাস্নান করলেন এবং “আমি নীলাচলে যাবো” বলে পুরীর দিকে যাত্রা করলেন”। (231)॥ বৃন্দাবনের দিকে আর এক পাও এগোলেন না। পিছন পানে হাঁটতে শুরু করলেন॥

. ” পদব্রজে চলতে চলতে মহাপ্রভু শান্তিপুরে এলেন এবং অদ্বৈত আচার্যের গৃহে পাঁচ সাত দিন থাকলেন”। (232)॥
. সেই সুযোগে অদ্বৈত আচার্য্য শচীমাতাকে সেখানে আনালেন এবং শচীমাতা তাঁর বাড়িতে থেকে নিমাইএর জন্য রান্না করলেন”। (232 & 233)॥
. ” তাঁর মায়ের অনুমতি নিয়ে শ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু জগন্নাথ পুরীর দিকে যাত্রা করলেন”। (234)॥
. এটাই তাঁর শেষ যাত্রা। আর বাংলায় কখনও ফিরে আসতে পারেননি। 48 বছরের একটা জীবনের শেষ 24 বছর কেটেছিলো দেশছাড়া হয়ে। ওদিকে দবির খাস (রূপ গোস্বামী) ও সাকর মল্লিকের (সনাতন গোস্বামীর) জীবন হয়েছিলো বেশ ভয়ংকর। হুসেন শাহ বুঝতে পারলেন, পাখি পালিয়ে গেছে। তাঁর সন্দেহ হলো, দবির খাস ও সাকর মল্লিক এর জন্য দায়ী। মনে মনে হুসেন শাহ দুজনকে বন্দী করবার ফন্দি করলে। বুঝতে পেরে সাকর মল্লিক সোজা গঙ্গা পার হয়ে পালিয়ে গেলেন বৃন্দাবন। আর দবির খাস বন্দী হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেন। কিছুদিন পর দবির খাস কারা রক্ষীদের ঘুষ দিয়ে হাওয়াস ঘাটে রাতের অন্ধকারে গঙ্গা পার হয়ে পালিয়ে গেলেন। তারপর সোজা বৃন্দাবন। তখন নবাব হুসেন শাহ রূপ ও সনাতনএর যাবতীয় জমিজমা , সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেন ॥
. অংশটুকু পড়ে পরিস্কার বুঝা যায় যে তার জীবন গৌড় দেশে নিরাপদ ছিলনা। তিনি তাঁর মা এবং পত্নীকে রেখে জগন্নাথ পুরীতে থাকতে বাধ্য হয়েছিলেন। চাঁদ কাজী ছিলেন হুসেন শাহের প্রতিনিধি। তার সঙ্গে টক্কর নেওয়ার ফলশ্রুতি হিসাবে তাঁকে হিন্দু রাজার পুরী ধামে আশ্রয় নিতে হয়॥

॥ সত্য স্বপ্রকাশ ॥ তা প্রকাশিত হবেই ॥

॥ সূত্র — শ্রীচৈতন্য চরিতামৃত — কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী — মধ্য লীলা — প্রথম খণ্ড ॥
. ॥ দবির ও সাকরএর পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা গৌড়এর জনশ্রুতি। হাওয়াস ঘাট এখনও আছে। তখন গঙ্গা অন্য পথে বইত॥

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here