বিজ্ঞান, আস্তিকতা ও ঈশ্বর

2

Last Updated on

-ভগবানকে আপনি দেখেছেন? কেউ দেখেছে?

-মহাপুরুষ রা দেখে থাকবে, আমি দেখিনি।

-তাহলে বিশ্বাস করেন কেন?

-আপনার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দাকে আপনি দেখেছেন?

-না, কি করে দেখব!

-তাহলে বিশ্বাস করেন কেন? তিনি ছিলেন?

-কি বোকা বোকা যুক্তি! আপনারা আস্তিকরা, এমন বোকা হন বলেই ভন্ড ধার্মিকরা আপনাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খায়।
আরে বাবা, তিনি না থাকলে, আমার ঠাকুর্দা, আমার বাবা, আর আমি এলাম কোথা থেকে?

-তাহলে বললেন কেন? ভগবানকে দেখেছি কিনা? সবকিছু কি দেখা যায়? বাতাস দেখতে পান? আর আপনার যুক্তিতেই প্রমান হচ্ছে যে ভগবান আছেন।

-কি রকম?

-ওই যে বললেন, আপনার ঠাকুর্দার ঠাকুর্দা না থাকলে আপনার বাবা, আপনি, এলেন কি করে? সেই যুক্তিতেই বলা যায়, ভগবান না থাকলে আমরা মানুষরা এলাম কি করে? সৃষ্টিকর্তা না থাকলে সৃষ্টি হয় কি করে?

-এটাও বোকাবোকা যুক্তি। মানুষ থেকেই পরবর্তী প্রজন্মের মানুষের জন্ম হয়। এটা বায়োলজি, বিজ্ঞান। এটা প্রত্যক্ষ সত্য। আপনার ঈশ্বর আপনার কল্পনা। ভগবান মানুষের জন্ম দেয়নি, মানুষের ভয় আর কুসংস্কারই ভগবানের জন্ম দিয়েছে।

-তাহলে প্রথম মানুষটা কি করে জন্মাল?

-হা হা হা, প্রথম মানুষ? ওসব প্রথম মানুষ টানুষ বলে কিছু হয় না। আদম, ঈভ বলে কেউ ছিল না। ওসব ধার্মিকদের কারসাজি। ধর্মের মত টুপি পরানো আর কেউ পারে না।
আরে মশাই ডারউইন পড়েননি? বিবর্তনবাদ! Theory of Evolution?

-হ্যাঁ, পড়েছি তো। প্রথমে সমুদ্রের জলে অ্যামিবার মত এককোষী প্রানীরা জন্ম নেয়। তারপর বহুযুগ ধরে এনিলিডা, আর্থোপোডা, রেপ্টিলিয়া, পিসেস ইত্যাদি স্তর পার হয়ে অবশেষে এল ম্যামালস বা স্তন্যপায়ী। তারপর বিবর্তনের পথ ধরে বানর শ্রেণীর নানা প্রানীর আগমনের পর শিম্পাঞ্জী হয়ে শেষে বনমানুষ। তাও অনেক Missing link এর ব্যাপার আছে।

-আরেব্বাস! এত সব পড়েও আপনি আস্তিক! আপনি তো পুরো জ্ঞানপাপী মশাই!

-তা হবে হয়ত, কিন্তু প্রশ্নটাতো রয়েই গেল। মানুষ তো অ্যামিবা থেকে এসেছে, কিন্তু অ্যামিবা কোথা থেকে এল?

-হুঁ হুঁ বাবা, জানেন না তো, ওই এককোষী প্রানীরা এল primordial soup বা আদিরস থেকে। প্রোটোপ্লাজম হল, D.N.A ( ডি অক্সি রাইবো নিউক্লিক অ্যাসিড) হল, নিউক্লিয়াস হল, সব হল।

-আর D.N.A? সেটা কোথা থেকে এল? Double Helix Structure? জীবের, কোষের Genetic Code? জিন? কোথা থেকে এল?
এমনি এমনি প্রোটিনগুলো ইচ্ছে মত জুড়ে গেল আর D.N.A. তৈরি হয়ে গেল? একটা D.N.A. এর গঠন বুঝতে বা Decode করতে সুপার কম্পিউটার এরও প্রচুর সময় লাগে। মাত্র এক শতাংশ D.N.A.র গঠনগত তফাতেই মানুষ থেকে ছাগল হয়ে যেতে পারেন। সে সব বিন্যাস ও সমবায় (permutation and combination) কে করল? সব এমনি এমনি হয়ে গেল? By Chance Only !?

-আরে মশাই, সে সব নিয়ে তো নিরন্তর গবেষণা চলছে। শয়ে শয়ে বিজ্ঞানী দিনরাত পরিশ্রম করে চলেছে গবেষনাগারে। অনেক কিছু জানাও গেছে। বিজ্ঞানের একটা নতুন শাখাই তো খুলে গেছে এব্যাপারে। Genetics and Genetic Engineering. ক্লোন হচ্ছে, GMO, জিন থেরাপি, কত কিছু হচ্ছে। নিত্যনতুন আবিষ্কার আর উদ্ভাবন হয়েই চলেছে। আর আপনারা পড়ে আছেন ভগবান নিয়ে। ভন্ড ধার্মিকগুলো আপনাদের মাথায় ঈশ্বরের ভুত ঢুকিয়ে দিয়েছে আর আপনারা সেই ভুত নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

-আচ্ছা, ধার্মিকরা কি ঈশ্বর মানে? মানে যারা ভগবানের নামে লোক ঠকায়! তারা কি আদৌ আস্তিক?

-আস্তিক আর ধার্মিক তো প্রায় একই হল। আপনার মাথায় কি গোবর আছে? ধার্মিকরাই তো সাধারণ মানুষকে পাপ পুণ্য, স্বর্গ নরকের গল্প শোনায়। স্বর্গের লোভ আর নরকের ভয় দেখিয়ে কত শত অপরাধই না করাচ্ছে নির্দোষ মানুষদের দিয়ে। নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য।

-Exactly dear friend, আমি ঠিক এটাই তো বলতে চাইছি। ওরা মানুষকে মিথ্যা বলছে, তাই তো?

-হ্যাঁ, তাই। মিথ্যাই তো বলছে। স্বর্গ নরক বলে কিছু আছে নাকি?

-একদমই তাই। ওরা মিথ্যা জেনেও মিথ্যা বলে লোক ঠকাচ্ছে। তার মানে ওই ধার্মিকরা জানে অর্থাৎ মনে মনে জানে এবং বিশ্বাস করে যে স্বর্গ নরক বলে কিছু নেই। ওরা জেনেবুঝেই লোক ঠকাচ্ছে। তাই তো?

-হ্যাঁ, সেটাই তো বলছি।

-আমিও সেটাই বলছি। যে ধার্মিকরা লোক ঠকাচ্ছে, তারা বোঝে এবং মানে অর্থাৎ বিশ্বাস করে, স্বর্গ, নরক, ভুত, ভগবান এসব কিছু নেই। কিন্তু লোককে ভয় দেখিয়ে পয়সা রোজগার করতে হলে, লোক ঠকাতে হলে, সবাইকে ভগবানের ভয়, নরকের ভয় দেখাতে হবে। স্বর্গের প্রলোভন দেখাতে হবে। তবেই তো ধর্মব্যবসা টিকবে। তাহলে ঐ ভন্ড ধার্মিক আর ধর্ম ব্যবসায়ীরাই তো সবচেয়ে বড় নাস্তিক! ভগবান নেই জানে বলেই তো নির্ভয়ে অপরাধ করে যায় দিনের পর দিন। নরক নেই জানে বলেই তো পাপের ভয় নেই। ওরাই তো আসল নাস্তিক। ওদের থেকে বিশুদ্ধ নাস্তিক আর কে আছে?

-তাই তো! এভাবে তো ভেবে দেখিনি!

-ভাবুন বন্ধু ভাবুন। ভাবতে পারি বলেই তো আমরা মানুষ।

-যাক গে, সে যাই হোক, মোটকথা ভগবান বলে কিছু নেই। ঈশ্বর দুর্বল মনের মানুষের কল্পনা মাত্র। মানুষ যখন বিজ্ঞান জানত না তখন আকাশে বিদ্যুৎ চমকালে বা বাজ পড়লে প্রচন্ড ভয় পেত। মনে করত দেবতা রুষ্ট হয়েছেন। ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, ভুমিকম্প সবকিছুকেই দেবতার কোপ মনে করত। পুজো অর্চনা করে দেবতাকে তুষ্ট করার চেষ্টা করত। এখন আর মানুষ তাই করে? এখন বিজ্ঞানের কল্যানে আমরা জানি স্থির তড়িৎ (static electricity) আধানের জন্য কিভাবে বজ্রবিদ্যুত উৎপন্ন হয়। বায়ুর ঘনত্ব ও মাটির তাপমাত্রার তারতম্যের কারনে কিভাবে ঝড় সৃষ্টি হয়। মহাদেশগুলোর নীচে বিভিন্ন Tectonic Plate এর স্থান পরিবর্তনের ফলে কিভাবে ভুমিকম্প হয়। এসবই এখন মানুষের জানা। তাই এসব হলে এখন আর মানুষ ভয়ে বিস্ময়ে দিশাহারা হয় না। দেবতার স্তবস্তুতি করে দেবতাকে শান্ত করার চেষ্টা করে না। কুসংস্কার অনেকাংশেই দূর হয়ে গেছে। তবু আপনাদের মত শিক্ষিত মানুষরাও যে কেন এখনও ঈশ্বরের মত কুসংস্কারকে আঁকড়ে পড়ে আছেন বুঝি না।

-তাই? প্রকৃতির কোন কিছুই আর বিস্ময়কর নেই? আচ্ছা, চারটে পাপড়িযুক্ত একটা ফুলের নাম করুন তো। কিম্বা ছটা পাপড়িওয়ালা ফুল।

-সে অনেক ফুলেরই চারটে বা ছটা পাপড়ি হতে পারে। কে গুনে দেখেছে?

-না। হতে পারে না। হয় না। বিজ্ঞানীরা গুনে দেখেছে। পৃথিবীর কোন ফুলেরই চারটে বা ছটা পাপড়ি হয় না। সাতটা, নটা,দশটা, এগারোটা বা বারোটা পাপড়িও হয় না। তবে তেরটা পাপড়ি হতে পারে। কিম্বা একুশটা পাপড়ি হতে পারে।

-কি সব নামতা বলছেন! এটা হতে পারে, ওটা হতে পারে না! কিছুই তো বুঝলাম না।

-বলছি। বিখ্যাত গণিতজ্ঞ ফিবোনাকি( Fibonacci) একটা সংখ্যা শ্রেনীর ( number sequence) কথা বলেন যার প্রথম দুটি সংখ্যা (first two member) হল শুন্য(0) ও এক(1)। এরপর যে কোন পদ (member) হবে আগের দুটি পদের যোগফল। অর্থাৎ তৃতীয় পদ (third member) টি হবে 0+1=1. চতুর্থ পদ হবে দ্বিতীয় ও তৃতীয় পদের যোগফল। অর্থাৎ চতুর্থ পদ = 1(দ্বিতীয় পদ)+1(তৃতীয় পদ)=2.
পঞ্চম পদ = 1(তৃতীয় পদ)+2(চতুর্থ পদ)=3.
ষষ্ঠ পদ = 2+3 = 5. এইভাবে চলবে। তাহলে সম্পুর্ন ফিবোনাকি সিরিজ( Fibonacci Series) টা দাঁড়াল এইরকম- 0, 1, 1, 2, 3, 5, 8, 13, 21, 34, 55, 89, 144, 233, 377,……আর এই সিরিজের সদস্য পদের সংখ্যাগুলিকে ( series members) বলা হয় ফিবোনাকি সংখ্যা ( fibonacci number).
আশ্চর্য ব্যাপার হল পৃথিবীর সমস্ত ফুলেরই পাপড়ির সংখ্যা কোন না কোন ফিবোনাকি সংখ্যা। ঘাসফুল হোক বা পদ্মফুল, গোলাপ হোক বা রাঙাজবা, পাপড়ির সংখ্যা সর্বদাই ফিবোনাকি সংখ্যা হবে। 4 , 6, 7, 9 ইত্যাদি সংখ্যাগুলো ফিবোনাকি সংখ্যা নয় বলেই ওই সংখ্যক পাপড়িযুক্ত ফুল হয় না।
শুধু ফুলই নয়, গাছের পাতা লক্ষ্য করুন, বেলপাতা দেখেছেন তো, হ্যাঁ, ত্রিফলক, অর্থাৎ তিনটে পাতা একটা বৃন্তে থাকে। আমের পঞ্চপল্লব। তেঁতুলপাতা গুনে দেখতে পারেন, ফিবোনাকি সংখ্যাই পাবেন। কলার কাঁদি দেখুন, এক একটা ছড়ায় কটা করে কলা আছে? গুনে দেখুন তেরো টা আছে। ফিবোনাকি সংখ্যা তেরো। এরকম আরো বহু উদাহরণ আছে।
শুধু উদ্ভিদজগৎ নয়, প্রানীজগতেও ফিবোনাকি সংখ্যার ছড়াছড়ি দেখলে অবাক না হয়ে পারবেন না। আপনার কটা হাত?
২টো। প্রতি হাতে কটা আঙুল? ৫ টা। মাকড়সার কটা পা? ৮ টা। স্টারফিস দেখেছেন তো! কটা পা? ৫ টা। অক্টোপাস এর কটা পা? ৮টা। সব সেই ফিবোনাকি সংখ্যা।

-কিন্তু মানুষের তো হাত পা মিলিয়ে চারটে। আর মশা, মাছি, পিঁপড়ে, আরশোলা এদের তো ছটা করে পা! তাহলে? এখানে কোথায় ফিবোনাকি সংখ্যা?
-আছে বন্ধু, আছে। বানরের লেজ দেখেননি? মানুষেরও লেজ ছিল। লেজ বিলুপ্ত হলেও পুচ্ছ কশেরুকা( tail bone) হিসাবে লেজের স্মৃতিচিহ্ন টুকু আজও রয়ে গেছে। তাহলে স্তন্যপায়ী প্রানীর প্রত্যঙ্গের সংখ্যা কি দাঁড়াল? হ্যাঁ, পাঁচটা।
আর পতঙ্গের ছটা পায়ের সঙ্গে দুটো শুঁড়ও থাকে, দেখেছেন নিশ্চই। হ্যাঁ, ৬+২=৮. অর্থাৎ আটটা প্রত্যঙ্গ। কাঁকড়া দেখেছেন তো! ছটা পা আর দুটো দাঁড়া। সেই আট, ফিবোনাকি সংখ্যা।

-আশ্চর্য! কেন এমন হয়?

-হ্যাঁ বন্ধু, আশ্চর্য! কেন এই নিয়ম? কেন এই শৃঙ্খলা? প্রকৃতি কেনই বা ফিবোনাকি সংখ্যাগুলো পছন্দ করবে? প্রকৃতি কি তবে সচেতন? প্রকৃতি কি গণিত জানে?
শুধু এই ফিবোনাকি সংখ্যাই নয় বন্ধু, প্রকৃতির পরতে পরতে রয়েছে শৃঙ্খলা, রয়েছে বিস্ময়। অসীম বিস্ময়ে তাই কবিগুরুও বলেছিলেন -“আকাশ ভরা সুর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ। তাহারই মাঝখানে আমি পেয়েছি, আমি পেয়েছি মোর স্থান, বিস্ময় তাই জাগে…।”
এই বিস্ময়ের মধ্যে কিন্তু কোন ভয় নেই। আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে ছুটোছুটি করার ব্যাপার নেই আদিম মানুষের মত। এই বিস্ময়ের মধ্যে আছে আনন্দ। এই বিস্ময়ের মধ্যে আছে অনন্তের ধারনা। এই বিস্ময়ের মধ্যে আছে অখন্ডতা। এই বিস্ময়ের মধ্যে আছে উৎসের অনুসন্ধান। কে আমি? কেই বা তুমি? আমরা কোথা থেকে এলাম? কেনই বা এলাম? না এলেই বা কি এমন ক্ষতি হত? এসেছি বলেই বা কার কি এল গেল? জীবনের অর্থ কী? উদ্দেশ্যই বা কী?

-উদ্দেশ্য থাকতেই হবে তারই বা কি মানে আছে? একটাই জীবন। পরলোক ফরলোক বলে কিছু নেই। বিন্দাস বাঁচুন। আনন্দে বাঁচুন। বিজ্ঞানমনস্ক হয়ে বাঁচুন। কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসুন।

-কুসংস্কার! আমি তো কোন কুসংস্কার মানি না। হাঁচি, টিকটিকি, কালোবেড়াল, জোড়াশালিক, কিছুই মানি না।

-আরে মশাই ভুত, ভগবান মানেন, ওটাই তো সবচেয়ে বড় কুসংস্কার।

-ভুত আর ভগবান এক হল?

-ওই হল। দুটোই কল্পনা, দুটোই কুসংস্কার।

-কোনটা কুসংস্কার? ভগবান আছেন বিশ্বাস করাটা কুসংস্কার? কেন? প্রমান নেই বলে?
তাহলে ভগবান নেই এটা বিশ্বাস করাটাও কুসংস্কার। কারন ভগবান নেই এটাও প্রমান হয়নি। আপনিও প্রমান ছাড়াই বিশ্বাস করেন যে ভগবান নেই। আমার বিশ্বাসটা কুসংস্কার হলে আপনার বিশ্বাসটাও কুসংস্কার।

-আরে কি মুশকিল! আপনি যা খুশি একটা মনগড়া জিনিষ কল্পনা করবেন আর আমাকে প্রমান করতে হবে যে সেটা নেই!?
এরকম হয় নাকি? তাহলে তো কাল্পনিক সবকিছুকেই বিশ্বাস করতে হয়। ভুত, প্রেত, দৈত্য, দানব, শয়তান, পিশাচ, সব।

-না, তা কেন? আজগুবি কল্পনা কেন বিশ্বাস করবেন? কেনই বা প্রমান করতে যাবেন? তবে হাবিজাবি কল্পনার সঙ্গে ঈশ্বরের কল্পনার তুলনা করাটা একেবারেই ঠিক নয়।
ভেবে দেখুন বিজ্ঞান কি বলছে। বিজ্ঞান বলছে, কারণ ছাড়া কোন কার্য হয় না। অর্থাৎ, কারণ ছাড়া একটা গাছের পাতাও নড়ে না।
প্রতিটা ছোট থেকে ছোট ঘটনার পিছনেও কোন না কোন কারণ আছেই আছে। তাহলে এই অকল্পনীয় বৃহৎ অসীম মহাবিশ্ব, কোটি কোটি ছায়াপথ (Galaxy), গ্রহ, নক্ষত্র, ধুমকেতু, উল্কা, নীহারিকা, এসব এমনি এমনি সৃষ্টি হল? বিনা কারনে আর বিনা উদ্দেশ্যে?

-না, বিনা কারনে কেন হবে? মহাবিশ্ব সৃষ্টি হয়েছিল এক মহা বিস্ফোরনের ফলে। যাকে বলে Big Bang. এই বিগ ব্যাং থিওরীই এখনো পর্যন্ত Physicists দের কাছে মহাবিশ্ব সৃষ্টির সবচেয়ে সমাদৃত ও সন্তোষজনক ব্যাখ্যা।

-কিন্তু Big Bang Theory ত্রুটিমুক্ত নয়। ঠিক মহাবিস্ফোরণ এর মুহূর্তে কি হয়েছিল তা জানা যায়নি। কারন ওইসময় মহাবিশ্বের সকল বস্তু ও সব শক্তি একটা বিন্দুর মত ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র স্থানে ঘনীভুত ছিল। সে এক অকল্পনীয় ব্যাপার। অঙ্কের ভাষায় সেই বিন্দু মহাবিশ্বের আয়তন(volume) ছিল শুন্য, আর ঘনত্ব (density)ছিল অসীম। এই ভয়ঙ্কর রকমের অকল্পনীয় অবস্থার নাম Singularity. এখন মুশকিল হল যে এই সিংগুলারিটির অবস্থায় সাধারণ ভৌতবিজ্ঞান বা Standard Physics এর কোন নিয়মই কাজ করে না। সে এক কুহেলিকা যা এখনো উন্মোচিত হয়নি।

-আজ যা বোঝা যায়নি, কাল বোঝা যাবে। আজ যা ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, কাল করা যাবে। তাই বলে কাল্পনিক এক সৃষ্টিকর্তাকে সব কৃতিত্ব দিয়ে দিতে হবে? সব তাঁরই সৃষ্টি, সব তাঁরই ইচ্ছা বলে কীর্তন করতে হবে? এটা কুসংস্কার নয়?

-না, ব্যাপারটা তা নয়। আজ যা বোঝা যাচ্ছে না, কাল তা বোঝা যাবে ঠিকই, কিন্তু আজকের প্রশ্নের যে উত্তর কালকে পাওয়া যাবে, সেই উত্তর থেকে আবার উঠে আসবে একগুচ্ছ নতুন প্রশ্ন। তারপর শুরু হবে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা।

-হ্যাঁ, তাতো হতেই পারে! তাতে হলটা কি? এভাবেই তো বিজ্ঞান এগিয়েছে, ভবিষ্যতেও এগোবে। নিত্যনতুন প্রশ্ন আর তার উত্তর খোঁজা। এটাই তো উন্নয়ন, এটাই তো প্রগতি। এরসঙ্গে ভগবানের কি সম্পর্ক?

-ধীরে বন্ধু, ধীরে। বড্ড তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্তে পৌছানোর চেষ্টা করেন আপনারা। ঠান্ডা মাথায় এবার ভাবুন, ব্যাপারটা তাহলে কি দাঁড়াল? প্রশ্নগুলোর উত্তর দেবে বিজ্ঞান। উত্তর থেকে উঠে আসবে নতুন কিছু প্রশ্ন। তারও উত্তর দেবে বিজ্ঞান। তার থেকে আবার উঠে আসবে আরো নতুন নতুন প্রশ্ন। তারপর আবার উত্তর খোঁজা, উত্তর পাওয়া, আবার নতুন প্রশ্ন, নতুন উত্তর, আবার, আবার, আবার…..তাহলে? এর শেষ কোথায়? শেষ কথা কে বলবে? কি হবে সেই শেষ উত্তর? যার পর আর কোন প্রশ্ন থাকবে না? যার পরে আর থাকবে না কোন কেন(why) অথবা কিভাবে(how)?
আর তার চেয়েও বড় কথা, বিজ্ঞান আজ পর্যন্ত কোন উত্তরটা দিতে পেরেছে, যার পরে আর কোন প্রশ্ন নেই? কোন ‘কেন’ বা ‘কিভাবে’ নেই?

-তাতে কি হল? কোন ব্যাপারে শেষ কথা বলতে পারেনি বলেই কাল্পনিক ঈশ্বরের দোহাই দিতে হবে? সবই তাঁর লীলা বলে এড়িয়ে যেতে হবে? এটাকে পলায়নি মনোভাব বলে (escapist mentality). বিজ্ঞানমনস্ক মানুষেরা এমন হয় না। তারা প্রশ্নগুলোকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে নেয়, আর উত্তর খুঁজে বার করে। তবেই না বিজ্ঞান এত উন্নতি করেছে! আপনাদের মত ভগবানের ল্যাজ ধরে বসে থাকলে তো হয়ে গেছিল!

-আচ্ছা বেশ। তর্কের খাতিরে একবার ধরে নেওয়া যাক ঈশ্বর বলে কিছু নেই। এবার আসুন, আমরা মৌলিক প্রশ্নগুলোর (fundamental questions) সন্তোষজনক উত্তর খুঁজি। প্রশ্নগুলো একবার দেখে নেওয়া যাক :
১) মহাবিশ্ব ঠিক কিভাবে সৃষ্টি হল? ( বিগ ব্যাং তত্ত্ব ত্রুটিপূর্ণ, সেকথা আগেই বলেছি)
২) মহাবিশ্বের শেষ পরিনতি কি?
৩) চেতনা (consciousness) কি?
৪) মহাবিশ্বের শুরু কোথায়? শেষ কোথায়? আয়তন কত?
৫) মহাবিশ্ব কিসের মধ্যে সম্প্রসারিত হচ্ছে?
৬) বস্তু, শক্তি এগুলো এল কোথা থেকে?
৭) মহাবিশ্ব সৃষ্টি হলই কেন?
৮) চেতনা, মহাবিশ্ব, বস্তু, শক্তি এসবের অস্তিত্ব থাকার কি প্রয়োজন?
৯) জীবন কি? জীবন কেন?
১০) একটাই জীবন, যার আগেও কিছু নেই পরেও কিছু নেই! এই অর্থহীন হেঁয়ালীর মানে কি? কিঁউ জিয়া পাতা নেহী, কিঁউ মরা পাতা নেহী!
জীবনের কোন মানে নেই, মহাবিশ্বের অস্তিত্বের কোন মানে নেই, আমার আমিত্বের কোন মানে নেই, তোমার তুমিত্বেরও কোন মানে নেই, আমাদের বিতর্কেরও তাহলে কোন মানে নেই, বিজ্ঞানের সমস্ত গবেষনা, সমস্ত আবিষ্কার, সমস্ত সুত্র, তথ্য, তত্ত্ব, কোনকিছুরই কোন মানে নেই, সব অর্থহীন, সব বেকার, সব মুল্যহীন, সব মরিচীকা, সব মায়া।
কি বন্ধু, কেমন ভয় ভয় করছে না !? একটা অস্তিত্ব সংকট ( Identity Crisis) অনুভব করছেন না !?
হতেই হবে। কারন সেটা সত্যি নয়। কোনকিছুরই কোন মানে নেই নয়। মানে আছে। উদ্দেশ্য আছে। থাকতে বাধ্য।
মানে আছে, উদ্দেশ্য আছে বলেই, আমি আছি। আপনি আছেন। জল আছে। অক্সিজেন আছে। আকাশ আছে। পৃথিবী আছে। মহাশুন্য আছে। মহাবিশ্ব আছে। আছে, আছে। সব আছে। সবকিছুর অস্তিত্ব আছে। অস্তি। অস্তি। আছে। আছে। তাই আমি আস্তিক। আমি আছি। আপনি আছেন। মহাবিশ্ব আছে। সবকিছু অস্তিত্বময়। হ্যাঁ বন্ধু, অস্তিত্ব (existence)। অস্তিত্ব আছে বলেই আমি আস্তিক। অস্তিত্ব আছে বলেই আমার আস্তিকতা। আর ঈশ্বর? তিনি আর কেউ নন, এই পরম অস্তিত্বই ঈশ্বর। That very existence of everything is God. অস্তিত্বই তিনি, তাই তিনিই সব। তিনিই সবকিছু। তিনি ছাড়া আর কিছু নেই। কারন অস্তিত্ব বা existence এর বাইরে যা কিছু তাই তো অনস্তিত্ব (non existence)। তাকেই তো ‘নেই’ বলে।
“ঔঁ, পুর্নমদ: পুর্নমিদং পুর্নাতপুর্নমুদচ্যতে, পুর্নস্য পুর্নমাদায় পুর্নমেবাবসিষ্যতে।”

লেখক:সম্বরণ চট্টোপাধ্যায়
(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত)

2 COMMENTS

  1. অসাধারন পর্যবেক্ষন।আজ থেকে অস্তিত্ব আর হারানোর মাঝে এক বিপুল সমস্যায় পড়লাম।আমি এখন আস্তিকতা আর নাস্তিকতার মাঝে বিচরণ করা দিকভ্রান্ত এক পথিক।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here