নায়ক(The Hero) : এক খ্যাতির শিখরে থাকা নায়কের চিরন্তন গল্প

0

Last Updated on

শিবাজি প্রতিম

সত্যজিত রায় পরিচালিত ত্রয়োদশ ছবি ‘নায়ক’। যার মুখ্য ভূমিকায় পরিচালক নিয়েছিলেন মহানায়ক উত্তম কুমারকে। এ বিষয়ে পরিচালককে তাঁর অন্য সব বিখ্যাত ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে নিলেও এক্ষেত্রে কেন অন্যথা হল প্রশ্ন করা হলে, মানিকবাবু উত্তর দিয়েছিলেন, যে এই চরিত্রে অন্য কোনো ব্যক্তিকে তিনি ভাবতেও পারেন নি।
নায়ক মুক্তি পায় ১৯৬৬ সালের ৬ই মে। গতকাল সেই ছবি মুক্তির ৫৩ বছর পূর্তি হয়েছে। একাধিক দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত নায়কের পরিচালকের সেই উত্তর যে ভীয়ণভাবে সঠিকই ছিল, তা বলাই বাহুল্য।

ছবির শুরু হয়, ছবির মুখ্য চরিত্র, টলিপাড়ার সাফল্যের শিখরে থাকা অরিন্দম মুখার্জীর একটি জাতীয় পুরস্কার নিতে যাওয়ার জন্য কলকাতা থেকে দিল্লী ট্রেন যাত্রা দিয়ে। ট্রেন যাত্রায় তার সঙ্গে আলাপ হয় একটি বাংলা পত্রিকার সম্পাদিকা অদিতি সেনগুপ্তের।(শর্মিলা ঠাকুর) কথাপ্রসঙ্গে তিনি নায়কের সাক্ষাতকার নিতে চাইলে নায়ক ফিরে যান তার প্রথম জীবনে। সেই পূর্বজীবনের স্মৃতি রোমন্থনকে ঘিরেই ছবি।

কথা বলার শুরুতেই নায়কের মুখ্য চরিত্র অরিন্দমকে দেখা যায় এক অতি সাধারণ মধ্যবিত্ত বাড়ির থিয়েটার করিয়ে ছেলে হিসেবে। শুরুর দিকে এক পরিচিত মৃত ব্যাক্তির অন্তোষ্টিক্রিয়া করতে গিয়ে পুনর্জন্ম, জন্মজন্মান্তরবাদ এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে বাস্তবের জীবনে সেই মতবাদের অসাড়তা বুঝতে পারেন অরিন্দম। এদিকে তার থিয়েটার জীবনের গুরু শঙ্করদা নায়কের সিনেমার জগতের উচ্চাকাঙ্খার কথা জানতে পেরে নারাজ হন। কিন্তু নায়ক তাতে কান দেন না। তার জীবন ক্রমশ এগোতে থাকে। ধীরে ধীরে নায়ক ক্রমশ খ্যাতির শীর্ষে ওঠেন। কিন্তু তার জীবন থেকে তার প্রিয়জনেরা সরে যেতে থাকেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য তার একসময়ের অতি প্রিয় বন্ধু বীরেশও একটি ঘটনার পর তার থেকে সরে যান। ঘটনচক্রে বীরেশ ট্রেড ইউনিওনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানে একদিন নায়কের সঙ্গে তার রাস্তায় দেখা হলে, কারখানার আন্দোলনকারীদের সাথে, তাদের উৎসাহিত করার কথা বলে নায়ককে তাদের সঙ্গে সময় কাটাতে বলেন। কিন্তু নায়ক জনগনের চোখে তার ইমেজ ভাঙতে চাননা। তাই রাজি হননা। এভাবেই বীরেশের সাথে তার সম্পর্ক তখনকার মত ছিন্ন হয়।
অন্যদিকে গল্পও এভাবে এগোতে থাকে ধীরে ধীরে। নায়কের ভূমিকায় অরিন্দম একে একে তার অতি সাধারণ থেকে খ্যাতির শিখরে ওঠার সফরের পুরোটায় অদিতিকে বর্ণনা করে ফেলেন। সাধারণ মানুষের সামনে তার ভগবান সুলভ ইমেজের পিছনের অন্ধকারটা অদিতি পুরোটায় বুঝতে সমর্থ হন। বুঝে গেলে তিনি ইণ্টারভিউ নেবেন বলে তার হাতের নোটে এতক্ষণ যা লিখছিলেন তা ছিঁড়ে ফেলেন নায়কের ভক্তদের মনে নায়কের যা ভাবমূর্তি তা ইণ্টারভিউে লেখা তার জীবনের বাস্তবতার কথা পড়লে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে ভেবেই অদিতি তা জনসমক্ষে আনতে চাননা।

নায়কের জীবনের খ্যাতি এবং বিপুল অর্থের বিড়ম্বনা পরিচালক খুব নিঁখুত ভাবে এই ছবিতে তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। অরিন্দমের জীবনে একদিকে যেমন বিশাল খ্যাতি, অর্থ, যশের সমাবেশ, অন্যদিকে পাহাড়প্রমাণ একাকিত্ব, নিসঙ্গতা, একের পর এক কাছের মানুষদের দূরে সরে যাওয়ার একঘেয়েমি হয়ে ওঠে শোবিজের জগতের চিরন্তন গল্প, যার থেকে ব্যাতিক্রম নন কোনো নায়কই। সেকারণেই ‘নায়ক’ ছবি অরিন্দমের জীবনের গল্প থেকে হয়ে ওঠে প্রতিটি নায়কের জীবনের চিরন্তন কথা। এখানেই পরিচালকের সাফল্য। পঞ্চাশের দশক থেকে নব্বইএর দশক অবধি টানা পরিচালক বাঙালীর জীবনকে যেভাবে দেখিয়েছেন এখানেও তা ব্যাতিক্রম না। সত্যজিত রায়ের এখানেই শ্রেষ্ঠত্ব। এই কারণেই তিনি বিশ্বের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ পরিচালকদের মধ্যে অন্যতম।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here